অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: মো: সেলিম রানা
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডে চলমান প্রশাসনিক অচলাবস্থা, বৈধ পরিচালনা পর্ষদের অনুপস্থিতি এবং সংঘবদ্ধ আর্থিক অনিয়ম এখন আর কেবল একটি কোম্পানির সংকট নয়—এটি দেশের পুরো বীমা ও পুঁজিবাজার ব্যবস্থার জন্য একটি গভীর অশনিসংকেত। আইনের তোয়াক্কা না করে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ উপেক্ষা করে এবং স্টক এক্সচেঞ্জের রহস্যজনক নীরবতার সুযোগ নিয়ে তালিকাভুক্ত এই বীমা কোম্পানিটি কার্যত একটি নিয়মবহির্ভূত সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্র, অভ্যন্তরীণ সূত্র ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে—দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড কার্যত কোনো বৈধ বোর্ড ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা কোম্পানি আইন, বীমা আইন ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালার চরম ও প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
চেয়ারম্যান-উধাও, এমডিকে মব করে অপসারণ, অদৃশ্য শক্তিতে চলছে কোম্পানি
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কোম্পানির চেয়ারম্যান
মোহাম্মদ সাঈদ খোকন (সাবেক মেয়র) সহ পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ও আত্মগোপনে রয়েছেন দেশে ও দেশের বাইরে । ফলে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানিটিতে নেই কোনো নিয়মিত চেয়ারম্যান, নেই বৈধ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), নেই বোর্ড সভা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিতে বোর্ড ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা কেবল অনৈতিক নয়—এটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের আওতাভুক্ত। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে সবকিছু চলছে যেন কিছুই ঘটেনি।
বোর্ড ছাড়াই সিইও নিয়োগ, সিগনেটরি ছাড়াই কোটি টাকা উত্তোলন
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন উঠেছে—বোর্ড সভা ছাড়া কীভাবে একজন সিইও নিয়োগ পান? বৈধ সিগনেটরি ছাড়া কীভাবে এমডি অনুপস্থিত অবস্থায় চেক স্বাক্ষর করে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন হয়?
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক, ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. মইনুল হাসান চৌধুরী এবং আন্ডাররাইটিং বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বোর্ডের কোনো অনুমোদন ছাড়াই আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন। এসব অনিয়মে প্রত্যক্ষ মদদ দিচ্ছেন ভাইস চেয়ারম্যান ও স্পন্সর ডিরেক্টর নূর মোহাম্মদ।
প্রিমিয়াম আয় হলেও টাকা যাচ্ছে কার পকেটে?
সূত্র জানায়, শুধুমাত্র ডিসেম্বর ২০২৫ মাসেই কোম্পানিটি প্রায় ৮ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করেছে। কিন্তু এর সিংহভাগ অর্থ প্রশাসনিক ব্যয়, অস্বাভাবিক কমিশন, ভাতা ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে। বীমা বিশ্লেষকদের মতে, বোর্ড অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের ব্যয় দেখানো সরাসরি শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে প্রতারণা।
উত্তরা ব্রাঞ্চে বেতন ও ক্লেইম কেলেঙ্কারি
উত্তরা ব্রাঞ্চের অনিয়ম যেন পুরো কোম্পানির একটি প্রতিচ্ছবি। সেখানে এক ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে মাসিক ৬ লাখ টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে—যার অন্তত ২ লাখ টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে উত্তরা ব্রাঞ্চের মাধ্যমে সংঘটিত ‘প্রতীক সিরামিক’ ক্লেইম কেলেঙ্কারির তদন্ত বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চলমান, যা দীর্ঘদিনের অনিয়মের প্রমাণ বহন করে।
আইডিআরএর চিঠি উপেক্ষা, ধীরগতির রহস্য
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) এসব অনিয়ম সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। জানা যায়, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আইডিআরএ ১০ দিনের সময় দিয়ে অবৈধভাবে অপসারিত এমডি আব্দুল খালেককে পুনর্বহাল ও সকল বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠায়। কিন্তু সেই নির্দেশকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোম্পানি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এরপরও আইডিআরএর পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ না আসায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্টক এক্সচেঞ্জের নীরবতা: স্বপ্ন ভাঙার পূর্বাভাস?
এই অনিয়ম সরাসরি লক্ষ লক্ষ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থবিরোধী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে শেয়ারহোল্ডারদের স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে যাবে—এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বোর্ড ছাড়া পরিচালনা চললেও স্টক এক্সচেঞ্জের নীরবতা পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক বার্তা বহন করে।শেষ কথা: কোন পথে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ভবিষ্যৎ?
বিশ্লেষকদের মতে, অবিলম্বে বৈধ বোর্ড পুনর্গঠন, স্বাধীন ফরেনসিক অডিট, অবৈধ নিয়োগ ও লেনদেন বাতিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড একটি কোম্পানির সংকট ছাড়িয়ে বীমা শিল্পের জন্য বড় দুঃসংবাদে পরিণত হবে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—ইডিআরএ ও সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কি আদৌ লক্ষ লক্ষ শেয়ারহোল্ডারের দায় নিতে পারবে? নাকি নীরবতাই হবে এই লুটপাটের সবচেয়ে বড় সহযোগী।
