সাবিনা আক্তার সাবিয়া:
রাজধানীসহ দেশজুড়ে সংবাদপত্রের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর প্রতারক ও চাঁদাবাজ চক্র। বিভিন্ন ভুঁইফোড় পত্রিকার নাম ভাঙিয়ে এই সংঘবদ্ধ চক্রটি সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। চক্রটির সাম্প্রতিক প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে— দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অফিসে গিয়ে 'ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর' ট্যাগ লাগানো এবং কাজকর্মে অনিয়ম বা দুর্নীতির বানোয়াট তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিনের পুরনো। গত ১৯ মার্চ ২০১৮ সালে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাইটিভির অপরাধবিষয়ক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘আমাদের চোখ’-এ এই চক্রটির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সে সময় ‘দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি’ এবং ‘দৈনিক ভোরের ধনী’—উভয় পত্রিকার নাম ব্যবহার করে রাজধানীজুড়ে ভুয়া সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে সংঘবদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজির তথ্য সচিত্র সম্প্রচার করা হয়। চক্রটি সাংবাদিকতার ভুয়া পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায় এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। ২০১৮ সালের সেই পুরনো চক্রটিই এখন ভিন্ন রূপ ধারণ করে নতুন ও ভয়ংকর টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছে।
পত্রিকার আড়ালে এই ভয়ংকর প্রতারক
চক্রটির এবারের টার্গেট; বিআইডব্লিউটিএ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী
মামুন উর রশিদ.!
এই চক্রের সর্বশেষ শিকার হয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ। আজ ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে ‘দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি’ পত্রিকায় "বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং প্রকল্পে লুটপাটের মহোৎসব: নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ সিন্ডিকেটে জিম্মি নৌপথ" শিরোনামে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর চক্রটি নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে আরও মানহানিকর তথ্য প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ বলেন, আমার প্রকল্পের সমস্ত কার্যক্রম শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে পরিচালনা করা হচ্ছে। এই চক্রটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্ট প্রকাশের পর তারা আমার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় তারা আমাকে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগানোর ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করার হুমকি দিচ্ছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং আইনি প্রতিকার চাচ্ছি।"
ভুঁইফোড় পত্রিকার এমন হলুদ সাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজির বিষয়ে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাংবাদিকতার আড়ালে চাঁদাবাজি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। 'দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি' বা 'ভোরের ধনী'র মতো ডিক্লারেশনবিহীন বা ভুঁইফোড় পত্রিকার বিরুদ্ধে এর আগেও নানা অভিযোগ এসেছে। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা নাগরিক যদি এমন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন, তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মাধ্যমে এসব নামসর্বস্ব পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানান, সাংবাদিকতার ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখানো, বানোয়াট তথ্য দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা এবং চাঁদা দাবি করা প্রচলিত দণ্ডবিধি প্যানেল কোড অনুযায়ী গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এখানে স্পষ্টত চাঁদাবাজি, প্রতারণা এবং মানহানির অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানায় প্যানেল কোডের ৩৮৩, ৪১৭ ও ৫০০ ধারায় মামলা বা জিডি করতে পারেন। এছাড়া সাইবার মাধ্যমে বা অনলাইনের মাধ্যমে এই অপপ্রচার চালানো হলে সাইবার নিরাপত্তা আইনেও মামলা করার সুযোগ রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত দ্রুত এই চক্রটিকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা।"
১৮ সালের ভিক্ষাবৃত্তি ও প্রতারণা চক্রটিই আজ ২০২৬ সালে এসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। সাংবাদিকতার পবিত্র পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রুখতে তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ ও দ্রুত অভিযান চালানো উচিৎ বলে মনে করেন সিনিয়র সাংবাদিক নেতারা।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়
মধ্য বেগুনবাড়ী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা।
Design and Developed by: Mehnaz IT