মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক রক্তের হয়, কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিশ্বাসের। আর কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা কোনো পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকেন না। তাঁরা শিক্ষক, অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণার নাম হয়ে ওঠেন। আমার জীবনে সেই মানুষটি হলেন সময় এডিশনের প্রধান সম্পাদক, দৈনিক জনতার মতামত পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, সাংবাদিক মো. শাহজাহান বাশার। আমার সাংবাদিকতার পথচলা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে প্রথম পরিচয়পত্র হাতে পাওয়ার দিনটি আজও আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের দিন। তখন স্বপ্ন ছিল একটাই, সত্য লিখব, মানুষের কথা বলব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরব।
কিন্তু বাস্তবতা স্বপ্নের মতো সহজ ছিল না। মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমাকে একের পর এক মামলা, হামলা এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমন এক সময় এসেছিল, যখন নিজের নিরাপত্তা আর পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হই। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শুরু হয় চোখভরা কষ্ট আর বুকভরা অপূর্ণতা নিয়ে। বিদেশের ব্যস্ত শহরে কাজ করেছি, মানুষের ভিড়ে থেকেও নিজেকে অসহায় মনে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে একটি প্রশ্ন, আমি কি আর কোনোদিন সাংবাদিক হিসেবে ফিরতে পারব, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে আমার জীবনে আসেন মো. শাহজাহান বাশার।
শুরু থেকে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন না। আমার সাংবাদিকতার প্রথম পদক্ষেপ তাঁর হাত ধরে হয়নি। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে ভাঙা মুহূর্তে তিনিই আমার হাত ধরেছিলেন। যখন অনেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি দূর দেশ থেকেও আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাকে শুধু সাহস দেননি, প্রতিদিন শিখিয়েছেন কীভাবে একজন সাংবাদিক নিজের সততা ধরে রাখে, কীভাবে একটি সংবাদ মানুষের আস্থা অর্জন করে এবং কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও কলম থামানো যায় না। প্রবাসে থাকা অবস্থায় অসংখ্য রাত কেটেছে তাঁর পরামর্শ শুনে। আমার লেখা তিনি পড়তেন, ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন, আবার লিখতে বলতেন। কখনো নিরুৎসাহ করেননি। বরং বলতেন, ভালো সাংবাদিক হতে চাইলে আগে ভালো মানুষ হও। এই একটি বাক্য আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
দেশে ফিরে আসার আগেই তিনি আমাকে দৈনিক জনতার মতামত পত্রিকার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দেন। আমি সর্বোচ্চ নিষ্ঠা দিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আমার কাজের মূল্যায়ন করে তিনি আমাকে উপসম্পাদক পদে পদোন্নতি দেন। পরে সেই মানুষটারি সন্তুষ্টিতে আমি নির্বাহী সম্পাদক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। প্রতিটি পদোন্নতির পেছনে ছিল তাঁর বিশ্বাস, তাঁর আস্থা এবং তাঁর নিরলস দিকনির্দেশনা। অনেকেই একজন সম্পাদকের কাছ থেকে দায়িত্ব পান। কিন্তু আমি একজন সম্পাদকের কাছে জীবন গড়ার শিক্ষা পেয়েছি। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন সংবাদ মানে শুধু তথ্য নয়, মানুষের কান্না, অধিকার এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি শিখিয়েছেন জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজ আমি যদি কোনো পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বলতে পারি, আমি একজন সাংবাদিক, তবে সেই পরিচয়ের পেছনে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটি মো. শাহজাহান বাশার।
আমি হৃদয়ের গভীর থেকে বলতে চাই, স্যার, আপনি আমার জীবনে শুধু একজন সম্পাদক নন। আপনি সেই মানুষ, যিনি আমার ভেঙে যাওয়া স্বপ্নগুলো আবার জোড়া লাগিয়েছেন। প্রবাসের অন্ধকারে যখন আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম, তখন আপনার বিশ্বাস আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। আজ আমার কলমের প্রতিটি শব্দে আপনার শিক্ষার ছাপ আছে। আপনার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়। শিক্ষাগুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা হয়তো পৃথিবীর কোনো অভিধানেই নেই। তবু একজন শিষ্য হিসেবে এতটুকুই বলতে চাই, আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনে আপনার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে লেখা থাকবে। কারণ আপনি আমার পথ দেখিয়েছেন, আর সেই পথেই আমি আজও সত্যের সন্ধানে হেঁটে চলেছি।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়
মধ্য বেগুনবাড়ী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা।
Design and Developed by: Mehnaz IT