মোঃ শাহজাহান বাশার
নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলেন নিজেদের গন্তব্যের দিকে। কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যবসায়, কেউ পরিবারের কাছে, কেউবা জীবনের অন্য কোনো প্রয়োজনীয় ঠিকানায়। সেই ব্যস্ত নগরের রাস্তায় দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ট্যাক্সির স্টিয়ারিং হাতে জীবিকার সংগ্রাম করে চলেছেন একজন মানুষ। কিন্তু তার নিজের গন্তব্য যেন অন্য কোথাও। জীবনের তিন দশকেরও বেশি সময় নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জন করলেও তার স্বপ্ন ছিল না শুধু নিজের পরিবারকে স্বচ্ছল করা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে আরাম-আয়েশ নিশ্চিত করা। তার স্বপ্ন ছিল আরও বড়, আরও মানবিক। তার ইচ্ছে ছিল—অর্থের অভাবে যেন কোনো মেধাবী কিংবা অসচ্ছল শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থমকে না যায়। সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই প্রবাসের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন নিজের জন্মভূমির মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে। তিনি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের সন্তান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।
একজন মানুষের জীবনকে শুধু তার পেশা দিয়ে বিচার করলে অনেক সময় তার প্রকৃত পরিচয়টি আড়ালে থেকে যায়। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই। পরিচয়ের এক জায়গায় তিনি নিউইয়র্কের একজন ট্যাক্সিচালক; কিন্তু আরেক জায়গায় তিনি একজন শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, দানশীল মানুষ এবং নিজের শেকড়ের প্রতি গভীরভাবে দায়বদ্ধ একজন প্রবাসী। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজের এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল না কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ছিল না কোনো তাৎক্ষণিক লাভের হিসাব; ছিল নিজের জন্মভূমি, নিজের গ্রামের মানুষ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য কিছু করে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা।
প্রবাসজীবন বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন। নিজের দেশ, পরিবার, পরিচিত পরিবেশ ও শেকড় ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে নতুন একটি সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিযোগিতা এবং নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে জীবন এগিয়ে নিতে হয়। নিউইয়র্কের মতো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত মহানগরে ট্যাক্সি চালানোও সহজ কোনো কাজ নয়। দিনের পর দিন রাস্তায় থাকতে হয়, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হয়, ক্লান্তি ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। কিন্তু সেই কঠিন জীবনের মধ্যেও মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী তার জন্মভূমিকে ভুলে যাননি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, নিজের মাটির প্রতি তার টান যেন আরও গভীর হয়েছে। প্রবাসের ব্যস্ততা তাকে নিজের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ধান্যদৌল গ্রামের মাটি, সেখানকার মানুষের জীবন, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ—এসব ভাবনা তাকে তাড়িত করেছে বারবার।
একজন মানুষের মনে কখন কোন প্রশ্ন জন্ম নেয়, সেটিই অনেক সময় তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর মনেও হয়তো এমন একটি প্রশ্নই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে—শুধু অর্থের অভাবে কেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়বে? কেন একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে না? কেন একটি গ্রামের সন্তান প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করার পথ বেছে নেননি; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী উদ্যোগের দিকে এগিয়েছেন। তার উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতায় নিজ এলাকায় গড়ে উঠেছে স্কুল, একাধিক কলেজ, প্রি-ক্যাডেট স্কুল, মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং একটি ফাউন্ডেশন। একটি মানুষ যখন নিজের উপার্জন দিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, তখন তিনি শুধু একটি ভবন নির্মাণ করেন না; তিনি আসলে অসংখ্য পরিবারের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেন।
একটি স্কুল মানে শুধু ইট-বালু-সিমেন্টের একটি ভবন নয়। একটি স্কুল মানে একটি শিশুর প্রথম স্বপ্ন। একটি কলেজ মানে উচ্চশিক্ষার নতুন দরজা। একটি গ্রন্থাগার মানে জ্ঞানের নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের সুযোগ। একটি মাদ্রাসা মানে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান মানে বিপদের সময়ে মানুষের আশ্রয়। আর একটি ফাউন্ডেশন মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। সেই অর্থে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কর্মকাণ্ডকে শুধু ব্যক্তিগত দান বা অনুদান হিসেবে দেখলে তার ব্যাপ্তি কমিয়ে দেখা হবে। বরং এটি একটি জনপদের ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ। কারণ আজ যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে, সেখান থেকে আগামী দিনে যে প্রজন্ম বের হবে, তারাই হয়তো শিক্ষক হবে, চিকিৎসক হবে, প্রকৌশলী হবে, উদ্যোক্তা হবে, সরকারি কর্মকর্তা হবে, সাংবাদিক হবে কিংবা সমাজের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ আজকের একটি প্রতিষ্ঠানের সুফল আগামী বহু বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেতে পারে।
আমাদের সমাজে মানুষের সাফল্যকে অনেক সময় অর্থ-সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা হয়। কার কত টাকা, কত বড় বাড়ি, কত দামি গাড়ি, কত বড় ব্যবসা—এসব দিয়েই যেন সফলতার হিসাব করা হয়। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য কি শুধু তার নিজের জন্য অর্জিত সম্পদের পরিমাণে? নাকি তার সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তিনি অন্য মানুষের জন্য কী রেখে গেছেন, তার ওপর? মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে তুলে ধরে। তিনি চাইলে প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থের বড় অংশ নিজের আরাম-আয়েশে ব্যয় করতে পারতেন। সেটি অস্বাভাবিকও হতো না। কারণ অর্থ তার নিজের শ্রমের ফল। কিন্তু তিনি অন্য একটি পথ বেছে নিয়েছেন। নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্য মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নিজের ভবিষ্যতের পাশাপাশি একটি জনপদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছেন। এই মানসিকতাই তাকে আলাদা করে তোলে।
একজন মানুষের সমাজসেবার পেছনে তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা এবং বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার বড় ভূমিকা থাকে। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রেও নিজের জন্মভূমি ও বাবা-মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তার উদ্যোগের অন্যতম অনুপ্রেরণা বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। মানুষ যত দূরেই যাক, তার শৈশব, তার গ্রামের মাটি, তার বাবা-মায়ের স্মৃতি কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও সেই স্মৃতিগুলো হয়তো তাকে বারবার নিজের গ্রামের দিকে ফিরিয়ে নিয়েছে। আর সেই ফিরে আসা শুধু স্মৃতিতে নয়, বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে। তিনি যেন নিজের জীবনের অর্জনের একটি অংশ আবার সেই মাটির কাছেই ফিরিয়ে দিয়েছেন, যে মাটি তাকে শৈশব দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকে আরও একটি দিক থেকে দেখার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের হাজার হাজার প্রবাসী মানুষ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তারা কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করছেন, দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু প্রবাসীদের অবদান শুধু রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অসংখ্য প্রবাসী রয়েছেন, যারা নিজ নিজ এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, মসজিদ, গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তারা দেশের বাইরে থাকলেও দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রেখেছেন। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর উদ্যোগও সেই বৃহত্তর প্রবাসী দায়বদ্ধতার একটি স্থানীয় দৃষ্টান্ত। তার জীবন প্রমাণ করে—শরীর বিদেশে থাকলেও হৃদয় নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও নিজের গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করা যায়। প্রয়োজন শুধু ইচ্ছা, সামর্থ্য এবং দায়বদ্ধতা।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তার কথা ভাবেননি, বরং দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরির দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে একদিনের জন্য কিছু অর্থ দেওয়া নিঃসন্দেহে মানবিক কাজ। কিন্তু এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দেওয়া, যেখানে বছরের পর বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে, তার প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত। একজন মানুষকে একদিন সাহায্য করা যায়, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিলে বহু মানুষকে দীর্ঘদিন সাহায্য করা সম্ভব। এই জায়গাটিই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর উদ্যোগকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। তার স্বপ্ন শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নয়; বরং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে।
আজকের বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটলেও সুযোগের বৈষম্য এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য রয়েছে। অনেক পরিবারের সন্তান মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। কোনো কোনো পরিবারে একটি সন্তানকে পড়ানোর সামর্থ্য থাকলেও অন্য সন্তানকে পড়ানো সম্ভব হয় না। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো ভালো ফলাফল করেও উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে না শুধু অর্থের অভাবে। এই বাস্তবতার মধ্যে যারা শিক্ষা বিস্তারে এগিয়ে আসেন, তাদের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিক্ষিত প্রজন্ম শুধু নিজের জীবন বদলায় না; তারা পরিবার বদলায়, সমাজ বদলায় এবং শেষ পর্যন্ত দেশের পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর উদ্যোগকে তাই শুধু একটি গ্রামের উন্নয়নের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি প্রবাসী সমাজের জন্যও একটি বার্তা। বিদেশে অবস্থানরত সফল বাংলাদেশিরা যদি নিজেদের এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাতে বিনিয়োগ করেন, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব অবশ্যই রাষ্ট্রকে পালন করতে হবে; কিন্তু রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের সামাজিক দায়িত্বও রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই গড়ে উঠতে পারে একটি উন্নত, শিক্ষিত ও মানবিক সমাজ।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্পে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো তার নীরবতা। তিনি কোনো বড় রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী নন। তার হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই। কিন্তু মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা রয়েছে। আর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য রয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রমে অর্জিত অর্থ ও আত্মত্যাগ। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে কাজ করে যান। তাদের কাজ হয়তো প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হয়তো ব্যাপক আলোচনা হয় না। কিন্তু তাদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠান, তাদের সহায়তায় শিক্ষিত হয়ে ওঠা মানুষ এবং তাদের কর্মকাণ্ডের সুফলই একদিন তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় ট্যাক্সির স্টিয়ারিং ধরে থাকা একজন মানুষ হয়তো প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু তার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল নিজের জন্মভূমির মানুষের ভবিষ্যৎ। তার ট্যাক্সির স্টিয়ারিং ছিল জীবিকার হাতিয়ার, আর তার শ্রমের অর্থ ছিল মানুষের জন্য স্বপ্ন বাস্তবায়নের শক্তি। একদিকে নিজের পরিবারের দায়িত্ব, অন্যদিকে নিজের গ্রামের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই যেন তার জীবন এগিয়ে গেছে।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? এই প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে সম্পদ, কারও কাছে প্রতিষ্ঠা, কারও কাছে ক্ষমতা। কিন্তু এমনও মানুষ আছেন, যাদের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো অন্যের জীবনে একটু আলো জ্বালানো। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী সেই ধরনের মানুষের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি হয়তো নিজের নামকে বড় করার জন্য কাজ করেননি; কিন্তু তার কাজের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবনে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিই তার নামকে মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট।
একজন মানুষ একদিন বয়সের ভারে কর্মজীবন থেকে সরে দাঁড়াবেন। ট্যাক্সির স্টিয়ারিং হয়তো আর হাতে থাকবে না। নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিনের সেই ছুটে চলাও একসময় থেমে যাবে। কিন্তু তিনি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সেখানে নতুন প্রজন্মের কোলাহল থাকবে। যে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে নতুন প্রজন্ম বই পড়বে। যে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সেখানে কোনো অসহায় মানুষ হয়তো চিকিৎসার সুযোগ পাবে। যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন, তা অন্য মানুষের জীবনের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে।
এটাই হয়তো একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন।
কারণ মানুষ একদিন চলে যায়, সম্পদও একদিন অন্যের হাতে চলে যায়, ক্ষমতা একদিন শেষ হয়ে যায়; কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া মানে শুধু তার বর্তমানকে বদলে দেওয়া নয়, তার ভবিষ্যৎকে বদলে দেওয়া। আর একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে গেলে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলায়। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলালে একটি সমাজের চিত্র বদলাতে শুরু করে।
এই কারণেই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প শুধু একজন প্রবাসী ট্যাক্সিচালকের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের শেকড়ের কাছে ফিরে আসার গল্প। এটি প্রবাসের ঘাম দিয়ে জন্মভূমির ভবিষ্যৎ নির্মাণের গল্প। এটি একজন মানুষের স্বপ্ন কীভাবে একটি জনপদের সম্পদে পরিণত হতে পারে, তার গল্প। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু দেশে বসবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একজন মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থেকেও নিজের দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন।
আজ যখন ব্যক্তিস্বার্থ, ভোগ-বিলাস এবং আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতিযোগিতা সমাজে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে, তখন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর মতো মানুষের গল্প সামনে আসা জরুরি। কারণ এমন গল্প শুধু একজন মানুষকে প্রশংসা করার জন্য নয়; বরং সমাজের অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করার জন্য বলা প্রয়োজন। একজন মানুষ যদি পারেন, অন্যরাও পারবেন। একজন প্রবাসী যদি নিজের অর্জনের একটি অংশ নিজের এলাকার মানুষের জন্য ব্যয় করতে পারেন, অন্য প্রবাসীরাও ভাবতে পারেন—আমিও আমার গ্রামের জন্য কিছু করতে পারি। একজন মানুষ যদি মনে করেন অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থামা উচিত নয়, তাহলে আরও অনেক মানুষ সেই একই স্বপ্ন দেখতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত একটি মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য হয়তো তার ব্যাংক হিসাবে কত টাকা ছিল, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নির্ধারিত হয়—তার কারণে কতজন মানুষের জীবন একটু সহজ হয়েছে, কতজন মানুষের চোখে নতুন স্বপ্ন এসেছে, কতজন শিক্ষার্থী অন্ধকার থেকে আলোর পথে যেতে পেরেছে।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এখানেই—তিনি নিজের জীবনের দীর্ঘ শ্রমের একটি অংশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নামে লিখে দিয়েছেন।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে তিন দশকেরও বেশি সময় ট্যাক্সির স্টিয়ারিং ধরে যে মানুষটি জীবিকার সংগ্রাম করেছেন, তার আরেকটি পরিচয় আজ আরও বড় হয়ে সামনে আসে—তিনি নিজের জন্মভূমির মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণে একজন নীরব কারিগর।
তার গল্প তাই শুধু ধান্যদৌলের গল্প নয়, শুধু ব্রাহ্মণপাড়ার গল্প নয়, শুধু কুমিল্লার গল্পও নয়। এটি বাংলাদেশের সেইসব প্রবাসী মানুষের গল্প, যারা দূরদেশে থেকেও নিজের দেশের মাটি, মানুষ ও ভবিষ্যৎকে হৃদয়ে ধারণ করে বেঁচে আছেন।
আর শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এটাই—
সে নিজের জন্য কতটা বেঁচেছে, তা নয়; বরং তার চলে যাওয়ার পরও অন্য মানুষের জীবনে তার কতটা আলো থেকে গেছে।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর স্বপ্ন যদি একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেয়, একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেয় কিংবা একটি প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে—তাহলে নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে তার তিন দশকেরও বেশি সময়ের শ্রম সত্যিই সার্থক।
কারণ ট্যাক্সির স্টিয়ারিং ধরে তিনি শুধু জীবিকা অর্জন করেননি; নিজের ঘাম দিয়ে তিনি জন্মভূমির ভবিষ্যতের জন্য একটি আলোর পথ তৈরি করেছেন।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়
মধ্য বেগুনবাড়ী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা।
Design and Developed by: Mehnaz IT