মোঃ রাসেল সরকার:
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রুপক্ষ কেবল সীমান্তেই অবস্থান করে না; বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সক্রিয় নীতিহীন ও অপপ্রচারে লিপ্ত গণমাধ্যমও সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে যেসব শক্তি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, তার অন্যতম হলো একশ্রেণির পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া ও 'তথ্য সন্ত্রাসী'।
জানিনা আমার এই বক্তব্য রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকদের চোখে পড়বে কিনা? তবে বাস্তবতা হলো, একটি কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকার এমনি এমনি গড়ে ওঠে না; তার পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে মিডিয়ার একাংশ। নির্দিষ্ট কিছু টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র—যেমন সময় টিভি, ৭১ টিভি, ডিবিসি এবং প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালবেলা, কালের কণ্ঠসহ একাধিক গণমাধ্যম তৎকালীন— ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের অন্দরমহলের অপশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে বলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সত্যকে আড়াল করে, কাল্পনিক ও ভুয়া বয়ান তৈরি করে এবং নিরবচ্ছিন্ন মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার পেছনে এই শক্তিগুলোই মূল হাতিয়ার ছিল।
দেড় দশক থেকে শুরু করে গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যখন এ দেশের ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত ঢেলে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল, তখনও এই নির্দিষ্ট মিডিয়া সিন্ডিকেটটি শাসকগোষ্ঠীর অন্দরমহলে বসে ছাত্র-জনতা হত্যার পক্ষে বয়ান তৈরি করেছে।
গণহত্যার মতো নৃশংস ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং আন্দোলন কারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে তারা নেপথ্যের কারিগর হিসেবে কাজ করেছে। এদের কারণেই বারবার এ দেশে স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান ঘটে এবং যুগে যুগে এ দেশের মজলুম জনগণের ওপর নেমে আসে নির্মম জুলুম-নির্যাতন। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, কীভাবে এই প্রোপাগান্ডায় লিপ্ত মিডিয়াগুলোর ইন্ধনে দেশপ্রেমিক ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
দৈনিক দিনকাল, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক আমার দেশ, ইসলামিক টেলিভিশন এবং চ্যানেল ওয়ান-এর মতো জনপ্রিয় ও স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোকে একে একে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ, নিরপেক্ষ ও নীতিবান গণমাধ্যম মাঠে সক্রিয় থাকলে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা প্রকাশ পেয়ে যেত; ফলে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা কিংবা জনগণের ওপর জুলুম চালানো অসম্ভব হয়ে উঠত। তৎকালীন দেশ নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া একটি প্রোগ্রামে
"অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সাইবার কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন— "আমাদের কোনো মিডিয়া নেই, তোমরাই আমাদের মিডিয়া। "গণতন্ত্র পূর্ণ উদ্ধার আন্দোলনের হাতিয়ার এবং জাতীয়তাবাদীর মূল শক্তি।
ইতিহাসের পাতায় নজর রাখলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, যতক্ষণ না দেশের সচেতন জনগণ ফ্যাসিবাদের সহযোগী এই মিডিয়াগুলোর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রে প্রকৃত গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। এরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মুখোশ পরে মূলত ‘স্বৈরাচারী সরকার তৈরির কারখানা’ হিসেবে কাজ করে এসেছে।
রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এই তথ্য সন্ত্রাসীদের মুখোশ উন্মোচন করা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান—যদি একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জনগণকে উপহার দিতে চান, তবে অবশ্যই এই তথ্য সন্ত্রাসী মিডিয়া হাউজগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
পরিশেষে একটি কথাই বলা যায়: বিলম্ব না করে, মজলুমের অধিকার আদায় ও স্থায়ী শান্তির পথ সুগম করতে ফ্যাসিবাদের সহযোগী মিডিয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
লেখক:
মোঃ রাসেল সরকার,
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
ঢাকা। ১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রীঃ,
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়
মধ্য বেগুনবাড়ী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা।
Design and Developed by: Mehnaz IT