হাফিজুর রহমান, কালীগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের এডিপি ও উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক নয়ছয়, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক মুখ্য সচিব ড. আব্দুর রশিদের বাড়ির এলাকা হওয়ায় তার নাম ভাঙিয়ে বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, ভাইপো ও খালাতো ভাইয়েরা পরস্পর যোগসাজশে জেলা ও নিজ এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, এসব প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান, সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী মাসুদ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির যোগসাজশে আত্মসাৎ করা হয়েছে। কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কোথাও নামমাত্র কাজ, আবার কোথাও কাজ না করেই কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এসব কাজে শুধু ঠিকাদারই নন, খোদ জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী প্রকৌশলী, সাবেক মুখ্য সচিবের বন্ধু প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তৈয়বুর রহমান, ভাইপো শিবলী রুমি ও মামাতো ভাই মাহমুদুর রহমান সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ভাইপো শিবলী রুমি বলেন, “দাদাভাই ক্লাবের টাকা নিয়েছি, তবে অন্যান্য প্রকল্প সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। বিষয়টি জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে হয়েছে।”
প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তৈয়বুর রহমান বলেন, “এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রকল্পের বিষয়ে সুপারিশ করেছি, তবে কোনো দুর্নীতির সঙ্গে আমি জড়িত নই।”
মাহমুদুর রহমান বলেন, “খুবদিপুর ঈদগাহ ও কদমতলা জামে মসজিদের সহ-সভাপতি হিসেবে কাজের অনিয়মের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই।”
ঠিকাদার আজমল হোসেন দাবি করেন, “আমি নিয়ম মেনেই কাজ করেছি। এ বিষয়ে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আব্দুর রশিদের বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার খড়িতলা এলাকায় হওয়ায় তার আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলা ও বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলার মথুরেশপুর, রতনপুর ও ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন রাস্তা, ঈদগাহ, মসজিদ, মন্দির ও ক্লাবের নামে উন্নয়ন বরাদ্দ নেওয়া হয়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খন্দকার ফরহাদ আহমেদ গত ২০/০২/২০২৫ তারিখে এসব প্রকল্পের অর্থ অবমুক্ত করেন। এডিপি ও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কিছু প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান করা হলেও অধিকাংশ প্রকল্প সিপিপিসির মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খুবদিপুর ঈদগাহ উন্নয়নে ১০ লাখ টাকা, কদমতলা বাজার জামে মসজিদে ১৫ লাখ টাকা, আল-আমিন জামে মসজিদে ৫ লাখ টাকা ও রহমতপুর বাইতুস সালাম জামে মসজিদে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। কোথাও টাইলস বসানো ছাড়া দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই বলে অভিযোগ।
এছাড়া চাচাই নূরানী হাফিজুল কুরআন ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ১০ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকার কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চক রামগোবিন্দপুর বাইতুর নূর জামে মসজিদে ২ লাখ টাকার বরাদ্দের মধ্যে ৮০ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে সভাপতি বদর আমিন জানান।
মথুরেশপুর ইউনিয়নের জামিয়া ইমদাদিয়া তালিমুল কুরআন মাদরাসার নামে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি। মহৎপুর পাবলিক কবরস্থানের বাউন্ডারি ও উপজেলা অফিস উন্নয়নের জন্য ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও উপজেলা ভূমি অফিসে কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
নিজদেবপুর মোল্লার বাড়ি থেকে তরফদার বাড়ি অভিমুখে রাস্তায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু তাহের জানান, একই নামে ছয় মাস আগে এডিপির অর্থায়নে তিনি রাস্তা নির্মাণ করেছেন। ফলে জেলা পরিষদের বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
নিত্যানন্দপুর দাদাভাই ক্লাবের নামে ২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলেও ক্লাবে কোনো কাজ হয়নি বলে ক্লাবের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে আমার জানা নেই।” সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী মাসুদ বলেন, “প্রকল্পে কী দেখতে হবে, তা আমার বিষয়। সাংবাদিকরা লিখলেও কিছু করতে পারবেন না। টাকার ভাগ সবাই পায়।”
উপজেলাবাসী এসব অনিয়ম-দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
