শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি কারামুক্ত হন। ওই সময় ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাসেও একটি গভীর ও বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা হয়।
ওই দিনের ঘটনায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল এবং তাঁর ছোট ভাই শেখ নাসের নিহত হন। একই ঘটনায় তাঁর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের কয়েকজন সদস্য, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর স্ত্রী আরজু মণি এবং নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও নিহত হন।
সে সময় দেশের বাইরে অবস্থান করায় শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। শেখ মুজিবুর রহমানকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এবং নিহত পরিবারের অন্য সদস্যদের ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী পাঁচ দশকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক নানা আলোচনা ও মূল্যায়ন হয়েছে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে রেখে তথ্য, প্রমাণ ও গবেষণার ভিত্তিতে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী তাই শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্মরণদিবস নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাষ্ট্রের জন্ম, রাজনৈতিক সংঘাত এবং পরবর্তী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় স্মরণ করারও উপলক্ষ।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে সত্য, তথ্য ও ন্যায়সংগত দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।