গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীকে মানুষের বসবাস উপযোগী করে অপরূপ সাজে সাজিয়েছেন। জগতের সবকিছুকে তিনি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ও নিয়োজিত করেছেন। দুনিয়ার জীবনের সুখ শান্তি, আনন্দ উল্লাস ও ভোগ বিলাস মানুষ সৃষ্টির মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য আল্লাহর সঠিক আনুগত্যের মাধ্যমে পরকালীন সফলতা ও মুক্তির পথ সুগম করা। মানবজাতির সঠিক পথ প্রদর্শন ও হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন দুনিয়াতে।
নবী-রাসুল আগমনের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ আগমন করেন পেয়ারা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নবী আগমনের ধারা তার মাধ্যমে পরিসমাপ্তি হয়। বিশ্ববাসীর জন্য তিনি বিশেষ রহমত। কিয়ামত পর্যন্ত তার জীবনার্দশ মানবজাতির কল্যাণ ও মুক্তির চাবিকাঠি।
নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর নবী নন। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের সব মানুষের নবী। রাহমাতুল্লিল আলামিন (সা.)। উম্মতের প্রতি তার দরদ ও ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। উম্মতের কল্যাণ সাধনা ছিল তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। উম্মতকে ঘিরে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কাটতো তার রাতদিন। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল এসেছেন, যিনি তোমাদের বিপন্ন কষ্ট পান। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ সুরা তওবা: ১২৮
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব নবীর এমন কিছু দোয়া আছে, যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়। সব নবী দ্রুত নিজেদের জন্য দোয়া করেছেন। আমি তা কিয়ামতের দিন উম্মতের সুপারিশের জন্য গোপন করে রেখেছি। আমার উম্মতের মধ্যে যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ইনশাআল্লাহ আমার সুপারিশ লাভ করবে।’ সহিহ মুসলিম:১৯৯
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণ, উম্মতের জন্য এক বিশেষ নির্দেশিকা। আনুষ্ঠানিকভাবে এটাই তার সর্বশেষ ভাষণ। এ ভাষণে তিনি বলেন, ‘হে লোক সকল! আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক পরহেজগার।’ সুরা হুজুরাত:১৩
কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের; কোনো আরবের ওপর অনারবের, এমনিভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব মানুষ হযরত আদম (আ.)-এর সন্তান। হযরত আদম (আ.) মাটি দ্বারা সৃষ্ট। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সব মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। তোমাদের অধীনস্থদের প্রতি খেয়াল রাখবে। তোমরা যা খাবে তাদের তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদের তা পরাবে। সাবধান! ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে না। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী বহু জাতি ধর্মীয় বিষয় বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বংস হয়েছে। তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। রমজান মাসে রোজা রাখবে। সন্তুষ্টচিত্তে সম্পদের জাকাত প্রদান করবে। স্বীয় প্রভুর ঘরে এসে হজ পালন করবে। তাহলে তোমাদের রবের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে…।’ তিরমিজি: ৬১৬
এই তো হলো উম্মতের প্রতি নবী কারিম (সা.)-এর নির্দেশনা ও ভালোবাসার প্রমাণ। ব্যক্তি জীবনেও তিনি ছিলেন আদর্শ ও অনুকরণীয়। হযরত আলী (রা.) ছিলেন নবী কারিম (সা.)-এর অন্তরঙ্গ সাথিদের একজন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণশৈলী সম্পর্কে হযরত হুসাইন (রা.)-এর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল ও বিনম্র স্বভাবের অধিকারী। তিনি রূঢ়ভাষী ও কঠিন হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন না। তিনি উচ্চস্বরে কথা বলতেন না, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতেন না, অপরের দোষ খুঁজে বেড়াতেন না এবং তিনি কৃপণ ছিলেন না। তিনি অপছন্দনীয় কথা থেকে বিরত থাকতেন। তিনি কাউকে নিরাশ করতেন না, আবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিতেন না। অর্থহীন বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা এবং অপ্রয়োজনীয় কোনো প্রসঙ্গের পেছনে লাগা এই তিনটি বিষয় থেকে তিনি দূরে থাকতেন। অন্যের বেলায়ও তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতেন কাউকে মন্দ বলা, কারও দোষ-ত্রুটি তালাশ করা এবং কারও গোপন অন্বেষণের জন্য আড়ি পাততেন না …।’ শামায়েলে তিরমিজি:২৬৯
আমরা জানি, আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে ইসলাম পূর্ণতা পেয়েছে। ইসলামের পূর্ণতা আনতে নবী কারিম (সা.)-এর জীবনে আত্মত্যাগ ও বিসর্জনের বিশদ এক অধ্যায় রচিত হয়েছে। দ্বীন প্রতিষ্ঠায় এমন ত্যাগী ও সাধক মানুষ পৃথিবী এর আগে কাউকে দেখেনি। তিনি মুসলিম জাতির মধ্যমণি, হৃদয়ের স্পন্দন। মুসলমানরা নিজেদের জীবনের তুলনায় তাকে বেশি ভালোবাসে। এ ভালোবাসা ইমানের দাবি। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় না হবো, ততক্ষণ পর্যন্ত সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না।’ সহিহ বোখারি।
লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, সাংবাদিক, কলামিষ্ট, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক, চেয়ারম্যান, গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, কুমিল্লা। ০১৭১৮২২৮৪৪৬