মোঃ শাহজাহান বাশার
সময়ের স্রোতে অনেক মানুষই হারিয়ে যান, কিন্তু তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও অবদানের স্মৃতি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। কুমিল্লার সাংবাদিকতা অঙ্গনের পরিচিত মুখ সাংবাদিক রমিজ খান ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা, সাংগঠনিক ভূমিকা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান আজও কুমিল্লার মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
নব্বইয়ের দশকে রমিজ খান জাতীয় দৈনিক দ্য নিউ নেশন-এর কুমিল্লা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় কুমিল্লার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সমস্যা ও সম্ভাবনার খবর জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের অধিকার ও পেশাগত সংগঠনেও তাঁর ছিল দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা।
তিনি জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, কুমিল্লা শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে তাঁর সঙ্গে সংগঠনের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল লেখকের। সাংবাদিকদের সংগঠিত করা, পেশাগত স্বার্থ নিয়ে কাজ করা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা সহকর্মীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।
সাংবাদিকতার বাইরে সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও রমিজ খানের সক্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি জিয়া পরিষদ, কুমিল্লা শাখার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠক হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে কেবল সাংবাদিক নয়, একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসেবেও পরিচিত করে তোলে।
রমিজ খানের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ। লায়লা নূর ম্যাডামের সঙ্গে তিনি ‘শিশু কানন’ নামে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। শিশুদের শিক্ষার প্রসারে এই উদ্যোগ ছিল তাঁর দূরদর্শিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।
পরবর্তী সময়ে রমিজ খান কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং কুমিল্লা জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি সংগঠক ও ছড়াকার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর কর্মময় পথচলার বিভিন্ন অধ্যায় কুমিল্লার সাংবাদিকতা অঙ্গনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রমিজ খান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লার সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শোকের আবহ নেমে আসে।
তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পরও স্মৃতিতে তিনি মুছে যাননি। ২০২৬ সালের আগস্টে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতিদের স্মরণসভায়ও রমিজ খানের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর জীবদ্দশার পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর কাজই তাঁকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাঁচিয়ে রাখে।
রমিজ খান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু কুমিল্লার সাংবাদিকতায় তাঁর পথচলা, সাংবাদিক সংগঠনে তাঁর ভূমিকা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং ‘শিশু কানন’-এর মতো শিক্ষামূলক উদ্যোগ তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।
কুমিল্লার সাংবাদিকতার সেই পরিচিত মুখ, সংগঠক ও সমাজসচেতন মানুষটিকে আজ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি।
মহান আল্লাহ তাআলা মরহুম রমিজ খানকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।