মোঃ শাহজাহান বাশার

একজন মানুষ কতটা সফল—তার উত্তর সবসময় তাঁর নিজের পদ-পদবি কিংবা অর্জনে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো সেই উত্তর লুকিয়ে থাকে তাঁর সন্তানদের জীবনে। একজন পিতা যখন তাঁর সন্তানদের শুধু বড় করে তোলেন না, বরং শিক্ষা, সততা, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে আলোকিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন, তখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়ে ওঠে তাঁর সন্তানরাই। বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম অধ্যাপক মোঃ ইউনুস ছিলেন তেমনই একজন সফল পিতা।

বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার এই কৃতী সন্তান নিজের কর্মজীবনে যেমন রেখে গেছেন সম্মান ও অবদানের স্বাক্ষর, তেমনি পারিবারিক জীবনেও রেখে গেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর পাঁচ সন্তান আজ দেশের ও দেশের বাইরে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। দুই সন্তান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সফল যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত, একজন বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবায় নিয়োজিত, একজন শিক্ষকতা পেশায় থেকে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলছেন এবং অপরজন বর্তমানে আমেরিকায় প্রবাসজীবনে প্রতিষ্ঠিত।

পাঁচ সন্তান, পাঁচটি কর্মক্ষেত্র, পাঁচটি আলাদা অর্জন—কিন্তু তাঁদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে একই পরিবারের শিক্ষা ও মূল্যবোধ। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন অধ্যাপক মোঃ ইউনুস।

শিক্ষকতা ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু শিক্ষা ছিল তাঁর জীবনদর্শন। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে কেবল একটি সনদ কিংবা ভালো চাকরি পাওয়া নয়; শিক্ষা মানে ছিল মানুষ হওয়া। সততা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা—এসব মূল্যবোধ তিনি নিজের জীবন দিয়ে যেমন ধারণ করেছেন, সন্তানদেরও তেমনি শিখিয়েছেন।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল বড়। তবে সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল না শুধু অর্থ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা; ছিল সন্তানদের যোগ্য ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সময়ের সঙ্গে তাঁর সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তাঁর সন্তানরা আজ যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নিজেদের কর্মের মাধ্যমে পরিবারের পাশাপাশি এলাকারও সম্মান বৃদ্ধি করছেন।

একজন পিতা যখন সন্তানের হাতে বিপুল সম্পদ তুলে দিতে না পারলেও শিক্ষা ও আদর্শের মতো অমূল্য সম্পদ তুলে দেন, তখন সেই সম্পদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে। অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের পাঁচ সন্তানের সাফল্য তারই প্রমাণ।

তাঁর দুই সন্তান রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে দেশের সেবায় নিয়োজিত। একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষের জীবন রক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আরেকজন দেশের সীমানা পেরিয়ে আমেরিকায় নিজের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পেশা ভিন্ন হলেও তাঁদের সাফল্যের মূল দর্শন যেন একই—শিক্ষা, পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে এগিয়ে চলা।

আজ অধ্যাপক মোঃ ইউনুস পৃথিবীতে নেই। তাঁর সন্তানেরা হয়তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের মুহূর্তগুলোতে তাঁর সান্নিধ্য পান না। কোনো বড় সাফল্যের খবর শুনে আগের মতো তাঁর মুখে আনন্দের হাসি দেখতে পান না। কিন্তু তাঁদের প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে তিনি যেন নীরবে জড়িয়ে আছেন। কারণ তাঁদের পরিচয়ের গভীরে রয়েছে তাঁর দেওয়া শিক্ষা, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর স্বপ্ন।

একজন পিতার জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে—সন্তানরা যখন তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর নামকে সম্মানের সঙ্গে বহন করে?

বর্তমান সময়ে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যখন অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামাজিক মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের পরিবার একটি ভিন্ন বার্তা দেয়। সন্তানকে প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা, পারিবারিক শৃঙ্খলা, পরিশ্রম এবং অভিভাবকের আদর্শিক দিকনির্দেশনা।

বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার মানুষের কাছে তাই অধ্যাপক মোঃ ইউনুস শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ কিংবা সাবেক সংসদ সদস্য নন; তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন সফল পিতা এবং একটি আলোকিত পরিবারের নির্মাতা। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনো স্থাপনা কিংবা সম্পদ নয়—তাঁর পাঁচ সন্তানই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

স্থানীয় গুণীজনদের মতে, একজন মানুষের প্রকৃত স্মৃতিসৌধ ইট-পাথরে নির্মিত হয় না; তাঁর প্রকৃত স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয় মানুষের হৃদয়ে এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কর্মে। অধ্যাপক মোঃ ইউনুস তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে যে শিক্ষা ও মূল্যবোধের বীজ বপন করে গেছেন, আজ তা সাফল্যের বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন পিতা পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন কখনো বিদায় নেয় না। সেই স্বপ্ন বেঁচে থাকে সন্তানের চোখে, তাঁদের কর্মে, তাঁদের সাফল্যে এবং তাঁদের মানুষের জন্য করা দায়িত্বের মধ্যে।

মরহুম অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের পাঁচ সন্তান আজ সেই স্বপ্নেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁদের সাফল্যের মধ্য দিয়ে একজন পিতার জীবনসংগ্রাম, ভালোবাসা, শিক্ষা ও আদর্শ যেন নতুন করে কথা বলে।

বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার সর্বস্তরের মানুষ মরহুম অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর পাঁচ সন্তানের উত্তরোত্তর সাফল্য, সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ প্রার্থনা করেন।

একজন পিতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর সন্তান। আর সেই সন্তান যখন শিক্ষা, সততা ও কর্মের মাধ্যমে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তখন সেই পিতার জীবনই হয়ে ওঠে এক অনন্য সাফল্যের গল্প। অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের জীবন ও তাঁর পাঁচ সন্তানের সাফল্য যেন সেই গল্পেরই উজ্জ্বল অধ্যায়।