গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
মহান রাব্বুল আলামিন পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। জমিনকে সমতল করে স্থির করে রেখেছেন এবং তার বুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য নিয়ামত। খাল-বিল, নদী নালা, সমুদ্র, গাছপালা-তরুলতা সবই মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। তবে আল্লাহ তায়ালার অগণিত নিয়ামতের মধ্যে কৃষি অন্যতম। এর মাধ্যমে তিনি মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। মানবীয় জীবন-যাপন কৃষি ব্যতীত কল্পনাই করা যায় না। সুতরাং বলা যায়, কৃষি মানব জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রধান মাধ্যম। তাছাড়া খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণ সব ক্ষেত্রেই কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম। ইসলাম কৃষিকে শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ইবাদত, মানবসেবা এবং আল্লাহর নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহারের একটি মহৎ কর্ম হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে মানুষ তাঁর বিপুল ক্ষমতার সামান্য হলেও অনুধাবন করতে পারে। সেসব সৃষ্টির মাঝে খাবারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, মানুষের উচিত নিজেদের খাদ্যসামগ্রীর দিকে লক্ষ্য করা এবং তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। আল্লাহ কীভাবে আকাশ থেকে জমিনের উপর পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর জমিন বিদীর্ণ করে তাতে শস্যদানা উৎপন্ন করেন তা চিন্তা করা উচিত। এরপর তিনি উৎপন্ন করেন আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, ঘন উদ্যান, ফলমূল ও ঘাস। এসবই মানুষের ও তাদের গবাদিপশুর উপকারের জন্য। (সুরা আবাসা, ২৪-৩২)
ইসলামে কৃষির গুরুত্ব:
অনেক নবী-রাসুল নিজেদের জীবিকার জন্য পরিশ্রম করতেন। কারণ ইসলাম সর্বক্ষেত্রে অলসতাকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং হালাল উপার্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। কৃষি হলো সেই হালাল উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে নবী করিম (সা.) বিভিন্নভাবে কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে’ (সহিহ বুখারি-২৩২০)।
অপর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং সে তা রোপণ করার সুযোগ পায় তবে সে যেন তা রোপণ করে’ (মুসনাদে আহমাদ)। এ হাদিসগুলো কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণের মর্যাদা তুলে ধরে এবং মানুষের কল্যাণে উৎপাদনমূলক কাজে মানুষকে উৎসাহিত করে।
কৃষির উপকারিতা:
কৃষির বহুমাত্রিক উপকারিতা রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কৃষির মাধ্যমে মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা হয়। ধান গম, ভুট্টা, শাক-সবজি, ফলমূল ও ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য
উৎপাদন কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষি ছাড়া মানব জীবন কল্পনা করা যায় না।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা:
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। একে কেন্দ্র করে পরিবহন, সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতসহ অসংখ্য খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা:
কৃষিপণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। ফলে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় এবং জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা:
বৃক্ষ ও ফসল বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। ফলে কৃষি ও বৃক্ষরোপণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখা:
একজন কৃষক ধৈর্য, পরিশ্রম, সময়ানুবর্তিতা এবং আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসার বাস্তব শিক্ষা লাভ করেন। তাই কৃষি কাজ মানুষের কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ গঠনে ভূমিকা রাখে।
সদকায়ে জারিয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে :
কৃষি ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে মানুষ অন্যের উপকার করার সুযোগ পায়। মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী তার উৎপাদিত ফসল বা ফল থেকে উপকৃত হলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
কৃষকের মর্যাদা:
ইসলাম কৃষির পাশাপাশি কৃষকের মর্যাদার প্রতিও লক্ষ্য রেখেছে। কারণ কৃষক নিজের শ্রমে জীবিকা অর্জন করেন এবং সমাজের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। তাই কৃষকের পেশা সম্মানিত। কৃষক ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় উভয় দৃষ্টিতে সম্মানের অধিকারী। একজন কৃষক যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তখন তাঁর শ্রম ইবাদতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ ও কৃষি:
গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ মাঠ সবুজ ধানের শীষে
পরিপূর্ণ বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে কৃষি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। গম ভুট্টা, শাক-সবজি, ফলমূল এবং নানা ধরনের কৃষিজ পণ্য আমাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের সব মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধু খাদ্যের জোগান দেয় না, বরং শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বলতে গেলে কৃষিকে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কৃষিকে সহজসাধ্য করা জরুরী:
যেহেতু কৃষি বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ দেশের মাটি মানুষ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কৃষক তাঁদের কঠোর শ্রম দিয়ে দেশের মানুষের জন্য খাদ্যের জোগান দেন এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাই কৃষিকে আরও সহজ, উন্নত ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য প্রয়োজন কৃষকের সমস্যাগুলোর দ্রুত ও যথাযথ সমাধান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য, সহজ ঋণ, উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
পরিশেষে বলতে চাই:
কৃষি ও কৃষককে অবহেলা নয়, বরং ইবাদতের চেতনায় কৃষির উন্নয়নে কাজ করে দেশকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করার চেষ্টা করা প্রত্যেক নাগরিকের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, সাংবাদিক, ধর্ম ও সমাজ সচেতন লেখক, চেয়ারম্যান- গাউছিয়া ইসলামিক মিশন ও সিনিয়র সহ সভাপতি বুড়িচং প্রেস ক্লাব, কুমিল্লা।০১৭১৮২২৮৪৪৬