মোঃ শাহজাহান বাশার
দেশজুড়ে যখন তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের চুলায় গ্যাসের চাপ কম—ঠিক সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধিতে অর্থ আদায়, অবৈধ সংযোগ, পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আর্থিক অনিয়মের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগে উত্থাপিত সব তথ্য ও দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধের অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তও এই প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে না। বরং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দুদকের অনুসন্ধানই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দিন দিন বড় হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে আনুমানিক ২ হাজার ১১৪ থেকে ২ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিক গ্রাহক—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথাও জানা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকরাও দিনের বড় একটি সময় চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
তিতাসের আওতাধীন এলাকাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে নেটওয়ার্কের বিভিন্ন এলাকায়। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় কম চাপের অভিযোগ রয়েছে।
এর সঙ্গে পুরোনো পাইপলাইনের ছিদ্র, ফাটল এবং কোথাও কোথাও পাইপলাইনে পানি প্রবেশের ঘটনাও গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই তিতাসের এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ১৯৯৯ সালে কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে শাহনেওয়াজ পারভেজ পেট্রোবাংলায় প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ পান। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত তিন বছরের বিটেক ডিগ্রির বিপরীতে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমমান সনদ বা ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট দাখিল করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে শাহনেওয়াজ পারভেজ একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন। ওই বলয়ের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ, লোড বৃদ্ধি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগের অন্যতম গুরুতর অংশ শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ এবং বিদ্যমান সংযোগের লোড বৃদ্ধিকে ঘিরে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ঘটনায় অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থের সঙ্গে শাহনেওয়াজ পারভেজের ব্যক্তিগত বা সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীন কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাংক লেনদেন, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলায় দায়িত্ব পালনকালে সমুদ্রের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানের বিডিং প্রক্রিয়া নিয়েও শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, ওই সময়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণে ব্যত্যয় ঘটিয়ে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে একটি ভারতীয় কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে পদোন্নতি এবং অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগও করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে এবং কয়েকটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। তবে সেসব তদন্তের ফলাফল কী হয়েছিল এবং কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও যদি সেগুলোর নিষ্পত্তি দৃশ্যমান না হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিতাস গ্যাসের এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অভিযোগ দিয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তও হয়েছে। তবে তদন্ত শেষে মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করা হলেও অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয়ে তাঁর পৃথক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তিতাসের এমডির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এখন দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় এলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা, অর্থ লেনদেনের তথ্য, নিয়োগ ও পদোন্নতির রেকর্ড, সম্পদ বিবরণী এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত বিপুল অর্থের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা এবং কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে লেনদেন হয়ে থাকলে তাঁদের ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
গ্যাস সংকট যখন দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, তখন রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিছক প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কারণ, গ্যাস সংকটের অভিঘাত শুধু তিতাসের গ্রাহকের চুলা কিংবা একটি শিল্পকারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের সক্ষমতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতি। ফলে তিতাসের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা হাজার কোটি টাকার অভিযোগের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি।