এম রাসেল সরকার:

রাজধানীতে দৈনিক ‘আমাদের মাতৃভূমি’ নামের একটি তথাকথিত পত্রিকার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর প্রতারক ও সাইবার অপরাধী চক্র। দেশের সাইবার জগতে অখ্যাত ও আন্ডারগ্রাউন্ড অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ভূঁইফোঁড় কিছু পত্রিকার আড়ালে এই নোংরা প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘আমাদের মাতৃভূমি’, ‘দুর্নীতির ডায়েরি’, ‘ভোরের আওয়ারা’ সহ বেশ কিছু নামসর্বস্ব পোর্টাল ও সুনির্দিষ্ট কিছু সাইবার অপরাধী এই অপপ্রচারের নেপথ্যে কাজ করছে।

সূত্রে জানা যায়, সমাজের উচ্চপদস্থ, ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে মানহানিকর, কুরুচিপূর্ণ এবং আপত্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব ব্যবহার করে এই চক্রটি একটি সুপরিকল্পিত ছক অনুযায়ী কাজ করে। এদের মূল লক্ষ্যই হলো—টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা। দাবিকৃত অর্থ না পেলেই রাতারাতি তাকে ‘দুর্নীতিবাজ’ বানিয়ে ঢালাও গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

​এই ভয়ংকর ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের সাম্প্রতিক টার্গেটে পড়েছেন মেসার্স সাইমন ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সরকারের প্রথম শ্রেণীর অনুমোদিত ঠিকাদার খন্দকার আব্দুল আউয়াল (সাইমন)। সূত্রে জানা গেছে, দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পরিচয়দানকারী মেছমাউল আলম (মোহন) ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়ালের কাছে ৭ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এই দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে উক্ত নামসর্বস্ব পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অর্জিত সামাজিক সুনাম ও ব্যবসায়িক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।

​ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী খন্দকার আব্দুল আউয়াল (সাইমন) এই প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি দীর্ঘকাল ধরে সততা, দক্ষতা ও পেশাগত সুনামের সাথে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। সরকারি বেসরকারি মহলে আমার একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান রয়েছে। কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই সম্পূর্ণ কাল্পনিকভাবে আমার বিরুদ্ধে এই মানহানিকর সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করা এবং চাঁদা আদায়ে বাধ্য করা। আমি এই চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

​অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রটির অপরাধের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এর আগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং প্রকল্পের এক নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিলেন এই মেছমাউল আলম (মোহন)। পরবর্তীতে ওই সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। শুধু তাই নয়, চক্রটির বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা চেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (CPC) বরাবরও লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।

​উল্লেখ্য, বিগত ১৯ মার্চ ২০১৮ সালে বেসরকারি টেলিভিশন ‘মাইটিভি’-এর অপরাধবিষয়ক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘আমাদের চোখ’-এ এই চক্রটির চাঁদাবাজি ও প্রতারণার সচিত্র প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছিল। তখন এ নিয়ে বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়।

​মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে এবং ৭ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন মিলনের মাধ্যমে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার সম্পাদক খাদিজা আক্তার পূর্ণী এবং ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মেছমাউল আলম (মোহন) বরাবর একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। (পত্রিকার স্থায়ী ঠিকানা: ৮০/২, ভিআইপি রোড, ৪র্থ তলা, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০)।

​অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন মিলন জানান, আমার মক্কেল খন্দকার আব্দুল আউয়াল একজন সুপরিচিত এবং প্রথম শ্রেণীর ব্যবসায়ী। কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত বা প্রমাণ ব্যতিরেকে এই কাল্পনিক সংবাদ প্রকাশের ফলে তিনি চরম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। নোটিশ প্রাপ্তির ৭ (সাত) দিনের মধ্যে এই মিথ্যা সংবাদ প্রত্যাহার, একই গুরুত্ব ও পরিসরে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে সংশোধনী প্রকাশ, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার লিখিত নিশ্চয়তা দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আমরা নোটিশ গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৪৯৯/৫০০ ধারা অনুযায়ী এবং দেশের প্রচলিত সাইবার আইনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হব।”

​এই বিষয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)-এর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ডিইউজে নেতারা বলেন, “সাংবাদিকতার পবিত্র পেশাকে ঢাল বানিয়ে যারা ব্ল্যাকমেইলিং ও সাইবার চাঁদাবাজি করছে, তারা কোনোভাবেই সাংবাদিক হতে পারে না। এই আন্ডারগ্রাউন্ড ও ভূঁইফোঁড় পত্রিকাগুলো প্রকৃত সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।”

​নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, প্রেস কাউন্সিল হচ্ছে গণমাধ্যমের শৃঙ্খলা বজায় রাখার সর্বোচ্চ ফোরাম। আমরা ভুক্তভোগীকে অবিলম্বে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহ অভিযোগ দায়ের করার আহ্বান জানাচ্ছি। একই সাথে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডিএমপির ডিবি ও সিআইডিকে অনুরোধ করব, ঢাকা শহরের বুক চিরে যারা এরকম আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা খুলে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে, তাদের ডিক্লেয়ারেশন (ঘোষণা) বাতিল করে যেন অবিলম্বে এই সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়।”

​ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল এই হলুদ সাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজ চক্রের হাত থেকে বাঁচতে এবং ন্যায়বিচার পেতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। চলবে..!

বিস্তারিত আসছে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে.!