গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।

পবিত্র আল কোরআনে ধৈর্যের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে। ধৈর্য মানবজীবনের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। ইসলামের দৃষ্টিতে ধৈর্য হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আল্লাহর উপর ভরসা অবিচল থাকা । এটি মানুষের ভেতরে নৈতিক শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। এটি মানুষের শক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আধ্যাত্মিক পরিপক্কতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইমান যদি হয় একটি পাখি, তবে ধৈর্য ও শুকরিয়া হয় তার দুটি ডানা। ইহকাল হলো পরীক্ষা ক্ষেত্র পরীক্ষায় পাস করার রসদ বা কাঁচামাল যেমন পড়ালেখা তেমনি দুনিয়া নামক এই পরীক্ষাক্ষেত্রে পরীক্ষায় পাস করার কাঁচামাল হচ্ছে ধৈর্য।

আল্লাহ তায়ালা যখন আমাদের বিভিন্ন নিয়ামতের মাধ্যমে পরীক্ষা দেন, তখন টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার হল্যে এই ধৈর্য শক্তি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন ‘হে মুমিনগণ তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, এবং নিজেকে সবদায় প্রস্তুত রাখো, আর আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পরো’ (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২০০)।
সীমাহীন প্রতিদান দানের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন ‘কেবল ধৈর্যশীলদের প্রতিদানই পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই’ (সূরা আয-যুমার,আয়াত: ১০)।

ধৈর্যের মতো এত মহৎ গুণের জন্য যেখানে মহান আল্লাহ নিজে পূর্ণরূপে প্রতিদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিনা হিসেবেই, সেখানে সকলেরই উচিত এই মহৎ গুণ অর্জন করা ও তার যথাযথ ব্যবহার করা। পাশাপাশি বিভিন্ন হাদিসেও তরুণ সমাজের মধ্যে এই রিলস শুধু ধৈর্যচুরির মধেই কেবল সীমাবদ্ধ নয় বরং পারস্পরিক সম্পর্কের আন্তরিকহীনতা, সময়ের অপব্যাবহারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব
একইসঙ্গে তাদের মধ্যে নেই কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সবাই সবার নিজেদের ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত। আনন্দ-বিনোদনের জন্য পাশে থাকা মানুষটি ওপর নয় বরং নির্ভরশীল নীল জগতের ভয়াল থাবার ওপর। আধুনিক যুগে অভিভাবকরাও অভিভাবক তাদের নিজের সন্তানদের সময় দেয় না বরং সময় দেয় বিভিন্ন ভিডিওতে। কয়েক সেকেন্ডের রিলস তথ্য জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা মূল্যবান সময়। উদ্দ্যেশহীনভাবে বা তাৎক্ষণিক বিনোদনের তাগিদে বিরামহীন ভুল শুধু সময়েরই নয় আত্মসংযমের অবনতি ঘটায়। প্লাটফর্মগুলো এমনভাবে কনটেন্ট তৈরি করে, যেখানে দেখানো হয় সময়ের স্বল্পতা, যেন ব্রেনকে ডাইভার্ট করা যায় সহজে এবং আগ্রহের সঙ্গে সামন্ত্রস্য রেখে সাজানো হয় ওই অপ্টেন্ট বা রিলস। ড্রলিং এর পর নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা আগ্রহ এবং কৌতুহল বাড়িয়ে দেয়। এভাবে নিজেদের অজান্তেই ব্যবহারী ডুবে যায় রিলসে। রিলস একেবারে প্রথমে আমাদের থেকে এক ঘণ্টা চায় না; সে চায় শুধু আরও কয়েক সেকেন্ড সে কয়েক সেকেন্ডেই ব্যাধির মতো শিকার করে ফেলে আমাদের।

আধুনিক যুগে স্মার্টফোন ছাড়া আমরা একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার বাদ দেওয়া এই সমস্যার উপযুক্ত সমাধান হতে পারে না। ব্যক্তি মানুষকে নিজ নিজ ধৈর্যে গুরুত্ব ও মাহাত্মা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও কল্যাণকর কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি (সহিহ বুখারী)। মালেক রাদিয়াল্লাহ তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত-নবী করিম (সঃ) বলেছেন- প্রকৃত ধৈর্য তো হলো বিপদ আসার প্রথম মুহূর্তে’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

কিন্তু আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার এই যুগে আমাদের ধৈর্যচু্তি এ কোন নীল নকশা আঁকছে। কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই রিলস সংস্কৃতি। আমাদের সময় বাঁচানোর উপায় ও ক্ষেত্র ঠিকই তৈরি করেছে আধুনিক সভ্যতা কিন্তু সেই সঞ্চিত সময়ের কতটা আমরা সত্যি কাজে লাগাতে পারছি। কয়েক সেকেন্ডের রিলসের অভ্যাস কি আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও ধৈর্যের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

মানুষের একসময় একটি মোটা গল্পের বই কিংবা উপন্যাসের বই এমনকি মহাকাব্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পড়তেন। আর বর্তমানে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও অনেকের কাছে দীর্ঘ মনে হয়। শেষ হওয়ার আগে আঙ্গুল উপরের দিকে চলে যায়, চলতে থাকে আঙুলের ডগা ও স্ক্রিনের ঘর্ষণ। তরুণ সমাজের নিকট গড়ে ওঠে দ্রুত বিনোদনের অভ্যাস। হ্রাস পেতে থাকে বই পড়া, ইবাদাত, পড়াশোনা কিংবা দীর্ঘমেয়াদী কাজে স্থির থাকার কর্মক্ষমতা।
সুফল ও কুফলের ওপর ভিত্তি করে সচেতন হতে হবে। ব্যাক্তি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে, নাকি প্রযুক্তি ব্যক্তিকে ব্যবহার করছে- এটি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। আসক্তি কমাতে এর কুফল ও সুফলগুলো অনুসরণ করে ব্যবহার করতে হবে। এটির নিয়ন্ত্রণে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান হতে পারে নিয়মিত নামাজ পড়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা, নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা, ইস্তেগফার ও দরুদ পড়া, নফল রোজা রাখা ইত্যাদি আমলগুলো করা যেতে পারে।

এছাড়াও ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নিজ নিজ জায়গা থেকে যা করতে পারেন তা হলো- ফোনের সময়ের অপচয় রোধে স্ক্রিন টাইম সেট করা, প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, প্রয়োজন ছাড়া যেন অপ্রয়োজনে ফোন ব্যবহার না করে। এছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয়, সমাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, সৃজনশীল কাজ, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা; এ সমস্যা সমাধানের কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে। পরিশেষে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ধৈর্যের মতোই মহৎ গুণ একজন মুমিন হিসেবে সকলের অর্জন করা ও তা ধরে রাখা উচিত। ফলশ্রুতিতে ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে লাভবান হওয়া সম্ভব।
সুতরাং, আলোকিত সুন্দর জীবন গঠনে প্রত্যেককে ধৈর্য্যশীল ভালো মানুষ হতে হবে।

লেখক : গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক, সাংবাদিক, চেয়ারম্যান- গাউছিয়া ইসলামিক মিশন ও সহ সভাপতি – বুড়িচং প্রেস ক্লাব, কুমিল্লা। ০১৭১৮২২৮৪৪৬