গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
সাম্প্রতিক প্রিয় শহর কুমিল্লা ভাল নেই। কুমিল্লার লালমাইয়ে সংঘটিত ২ টি সহ তিনটি হত্যাকান্ড বিশেষ করে তাজমিন ও অপ্রতিম এর আগে বুলেট বৈরাগী। এসব ঘটনায় কুমিল্লা থেকে সারাদেশে ভয়, আতংক, দূ- চিন্তা বেড়েই চলেছে। মোট কথা রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার উপক্রম অভিভাবক সহ দেশের সাধারণ মানুষজনদের।
মানুষ নামের পশুদের কৃতকর্মের কারণে বর্তমান সময়ে সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব বলে পরিগণিত হচ্ছি আমরা।যদিও মানুষ হিসেবে আমরা সৃষ্টি জগতে সেরা জাতি। কিন্তু, যে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ থাকে না, তাকে মানুষ বলা যায় না। মানুষ বলতে মানুষের ভেতর মানবীয় গুণ থাকতে হয়, মানবিক আচরণ থাকতে হয়। শুধু মনুষ্যকুলে জন্ম নিলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হতে হলে মানবিক গুণ নৈতিকতা, সহিষ্ণুতা থাকতে হয়। চিন্তা-চেতনার বিকাশ, বিবেকবোধ, কাণ্ডজ্ঞান আর বিচার বৃদ্ধির ক্ষমতার কারণে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মানুষ মনুষ্যত্বের অধিকারী হবে সেটাই স্বাভাবিক। মানবতা বা মনুষ্যত্ববোধ না থাকলে মানুষ কখনই মানুষ ন্যয়। কিন্তু বর্তমানে প্রাত্যহিক লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, উগ্রতা, স্বার্থপরতা, ক্রোধ প্রভৃতির কারণে মানুষের মনুষ্যত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। এক কথায় মনুষ্যত্ব আজ নির্বাসনে।
পৃথিবীতে সন্তানের একমাত্র সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো তার বাবা ও মা। একজন মানুষ যদি পৃথিবীর সব মানুষ কর্তৃক অবহেলিত হয় বা তার কাছে সুন্দর পৃথিবী যখন অন্ধকারে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন হতাশার চাদরে আবৃত সেই মানুষের কাছে বাবা-মা আশার প্রদীপ ও নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
বর্তমান সমাজে নিজ পরিবারই যেন নিরাপত্তাহীন। কোথাও কোথাও দেখা যায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা পরকীয়া সম্পর্কের কারণে নিজ মা বা বাবা সন্তানকে হত্যা করছে। আজ যেন আমরা পাশবিকতার ষোলকলা পূর্ণ করছি। আমাদের মধ্যে আজ যেন মনুষ্যত্বের লেশমাত্র নেই। আমরা আজ যে মনুষ্যত্বহীন সমাজে বাস করছি তার দায় কিন্তু আমাদেরই। আমরা দিনে দিনে আমাদের সমাজটাকে একটা চরম বর্বরতার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি।
মানুষের মনুষ্যত্ব যখন চরমভাবে লোপ পায় তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না, হয়ে ওঠে হায়েনা। তখন সমাজে দ্রুত বেড়ে যায় অপরাধ প্রবণতা। খুন, গুম, ধর্ষণ, লুটপাট, চুরি, ডাকাতি, যৌন হয়রানি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, ঘুষ, অপহরণ দুর্নীতি, অরাজকতা, মিথ্যা বলা, অন্যের ক্ষতিসাধন, অন্যকে বিপদে ফেলা ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টি ইত্যাদি কাজ প্রতিনিয়তই সংঘটিত হতে থাকে।
সমাজে প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভালো এবং মন্দের দ্বন্দ্ব থাকবে। আর এটাই স্বাভাবিক। সব খারাপ বা মন্দকে পরিহার করে ভালো বা সৎ কর্মকে বেছে নেওয়া, ভালো পথ অনুসরণ করা মনুষ্যত্বের অন্যতম কাজ। আদর, দয়া, মায়া, মমতা, বিনয়ী, মা, স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা, উদারতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সততা, ধৈর্য, ত্যাগ, সহনশীলতা, সহানুভূতি, সৌজন্য, আদব-কায়দা, শৃঙ্খলা, কল্যাণচিন্তা করা নৈতিক দায়িত্ব।
কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি আমরা; মা নিজ হাতে জবাই করে হত্যা করেছে গর্ভজাত কন্যাকে। অপরদিকে সৎ বাবার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় মাত্র তিন বছরের শিশু।
দেশে পরিবারের সদস্যদের হাতে শিশু নির্যাতন, শিশু হত্যার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিনিয়তই ঘটছে এমন ঘটনা। প্রায় সব ঘটনাতেই আসামিদের নিয়ে আসা হচ্ছে বিচারের কাঠগড়ায়। বিচার হচ্ছে, তবে তাতে রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক সময় আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষের মনুষ্যত্বের মূল উপাদান। সমাজে প্রতিটি মানুষের মধ্যে লুক্কায়িত থাকে মনুষ্যত্ব। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সেই মনুষ্যত্বকে লালন করার কথা। কিন্তু আজ কোথায় সেই মনুষ্যত্ব? মারামারি-হানাহানিসহ সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আজ যেন ‘ডাল-ভাত’।
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই সমাজের প্রতিটি শিশু নিজের পরিবারের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে গণ্য। আজ সেই নিরাপদ স্থানটি তাসের ঘরের মতো উবে গেছে। গত ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি দুদিনে দেশে দুটি হত্যাকাণ্ডে বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। যেখানে পরিবারের কাছে একজন মানুষ নিরাপদ থাকার কথা সেখানে দুটি হত্যাকাণ্ডই সংঘটিত হয়েছে পরিবারের (আপন মা ও সৎবাবা) সদস্যদের হাতে।
দেশে একের পর এক ধর্ষণ, শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে. বিশেষ করে আমার প্রিয় জেলা ও শহর কুমিল্লা ইদানিং চুরির, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণ, মাদক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া দুটো তাজা প্রাণ ঝরে গেল আমাদের চোখের নাগালেই। এসব অপরাধ ও অপরাধীদের নাগাল টেনে ধরা জরুরি। আমি অভিভাবক ও সচেতন মহল এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সজাগ ও সচেতন হবার অনুরোধ জানাব। কিন্তু, অবাক হওয়ার বিষয় ১৩ বছর বয়সের সন্তানদের হাতে আইফোন কেন? কেনই বা ১৩ বয়সী একটা মেয়ে বাসার বাইরে ৩/৪ দিন মা- বাবার অজান্তে অন্যের হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে যাবে? এখানে কি আমাদের ব্যর্থতা নয়? সর্বোপরি, বলতে চাই আসুন, আদরের সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কাদের সাথে চলে, এসব বিষয়ে খোঁজ – খবর রাখি, অভিভাবক হিসেবে আমাদের সচেতন ও সজাগ থাকা দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা আর দেখতে চাই না, জান্নাতুল তাজমিন, অপ্রতিম বা বুলেট বৈরাগী। এভাবে কেউ অকালে নির্মম ও নিষ্ঠুর ভাবে হারিয়ে না যাক। বুলেট বৈরাগী ২৫ এপ্রিল রাতে, অপ্রতিম ১৯ সেপ্টেম্বর এবং তাজমিন ৮ অক্টোবর গভীর রাতে হত্যাকান্ডের শিকার হন। কুমিল্লার শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ চায়,স্বাভাবিক ভাবে, নিরাপদ ও নির্ভয়ে বাঁচতে এবং শিক্ষা, শান্তি ও ঐতিহ্যের ধারা এগিয়ে নিতে। সকল অন্যায়, অবিচার,খুন, ধর্ষণ ও মাদকমুক্ত সুন্দর কুমিল্লা গড়ে তুলতে। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি এগিয়ে যাক আর মানুষের মধ্যে জাগ্রত হোক মানুষের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতা। মানবতা ও মনুষ্যত্বের বিষয়টি পুরোপুরি মানুষের চিন্তা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। মানুষ একমাত্র তাদেরই বলা যায় যাদের মানবতা এবং মনুষ্যত্ব জ্ঞান বলে কিছু একটা আছে। কামনা করছি আমাদের দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, নির্যাতন, শিশু হত্যা নেমে আসুক শূন্যের কোটায়। মানুষের বিবেক জাগ্রত হোক।
লেখক : গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, সাংবাদিক, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক, চেয়ারম্যান- গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, শূরা সদস্য – বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও সহ সভাপতি – বুড়িচং, প্রেস ক্লাব কুমিল্লা।০১৭১৮২২৮৪৪৬