মোঃ শাহজাহান বাশার
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পবিত্র জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে আয়োজিত এক মিলাদ মাহফিলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর পিতা-মাতাকে নিয়ে অবমাননাকর বা কটূক্তিপূর্ণ বক্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন শাহসুফী ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী ওয়াল-হোসাইনী আল-মাইজভাণ্ডারী।
তিনি বলেছেন, মহানবী (দ.)-এর পিতা-মাতাকে কটূক্তি বা অবমাননা করা তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আদবের পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (দ.)-কে কষ্ট দেওয়া বা তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে—এমন বক্তব্যের বিষয়ে কোরআনে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উত্তর নোয়াগাঁওয়ের আল্লামা রুমি (রহ.) দাখিল মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, মহানবী (দ.)-এর পিতা-মাতার বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে মুসলমানদের সর্বোচ্চ আদব, সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কোনো ধর্মীয় বা মতভেদপূর্ণ বিষয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়, যা রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর সম্মান ও মর্যাদাকে আঘাত করে।
তিনি বলেন, মহানবী (দ.)-এর পিতা-মাতা তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই ইন্তেকাল করেন। তাঁদের পরিণতি নিয়ে আলোচনা করতে হলে ইসলামের ‘আহলে ফাতরাত’-সংক্রান্ত নীতি ও এ বিষয়ে আলেমদের ব্যাখ্যাগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোরআনের নীতিমালায় রাসুল প্রেরণের আগে কোনো জাতিকে শাস্তি না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত।
মহানবী (দ.)-এর পিতা-মাতার নাজাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আহলে সুন্নাতের আলেমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিষ্ঠিত মত হলো—তাঁদের বিষয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা সমীচীন নয়। এ বিষয়ে মিসরের আল-আজহারের আলেমদের অবস্থানও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, মহানবী (দ.)-এর পিতা-মাতার পরিণতি নিয়ে আলোচনায় যেসব হাদিস উদ্ধৃত করা হয়, সেগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই কোনো হাদিসের শব্দের বাহ্যিক অর্থের পাশাপাশি আরবি ভাষার ব্যবহার, হাদিসের প্রেক্ষাপট এবং কোরআনের সামগ্রিক নীতিমালাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আরবি ভাষায় ‘পিতা’ শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শব্দটি সব ক্ষেত্রে কেবল জৈবিক পিতাকে বোঝায় না; চাচা, পূর্বপুরুষ বা পিতৃস্থানীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার পাওয়া যায়। ফলে কোনো শব্দের সরল অর্থের ওপর ভিত্তি করে মহানবী (দ.)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ (রা.)-এর পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, এ ধরনের আলোচনা হাদিস অস্বীকারের বিষয় নয়; বরং হাদিসের অর্থ, প্রেক্ষাপট, আরবি ভাষার প্রচলিত ব্যবহার এবং আহলে সুন্নাতের আলেমদের ব্যাখ্যাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার বিষয়। মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরস্পরকে হেয় না করে গ্রহণযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে আলোচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
নবীপ্রেমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, নবীপ্রেম শুধু মুখের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর প্রতি আদব, সম্মান, ভালোবাসা ও তাঁর আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই এর বাস্তব প্রকাশ ঘটে। তাই মহানবী (দ.)-এর পরিবার ও পিতা-মাতার বিষয়ে কথা বলার সময়ও মুসলমানদের সেই আদব ও সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন।
উত্তর নোয়াগাঁও আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়া ও মইনীয়া যুব ফোরামের উদ্যোগে এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহযোগিতা করে মইনীয়া ছাত্র ফোরাম, স্থানীয় এলাকাবাসী ও প্রবাসীবৃন্দ।
মাহফিলে বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা ঘিলাতলা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন শায়খ মুফতি বাকী বিল্লাহ আল-আজহারী, মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ জাহেদুল হক আল-কাদেরী, মাওলানা মুহাম্মদ মোরশেদুল আলম মাইজভাণ্ডারী, মাওলানা মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন মাইজভাণ্ডারী এবং মাওলানা সরওয়ার আলম মাইজভাণ্ডারী।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শাখার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সাইফুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুহাম্মদ হোসাইন সওদাগর, মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও মুহাম্মদ সাইফুদ্দীন মঞ্জু।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খলিফা মুহাম্মদ শামসুল আলম ভাণ্ডারী।
মাহফিলে মহানবী (দ.)-এর জীবনাদর্শ, নবীপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহনশীলতার ওপরও আলোচনা করা হয়। পরে দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্বমানবতার শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করা হয়।

