ঢাকাTuesday , 27 October 2026
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলামিক
  7. কবিতা
  8. কলাম
  9. কুমিল্লা জেলার খবর
  10. খেলা
  11. জাতীয়
  12. জেলা খবর
  13. তথ্যপ্রযুক্তি
  14. দৈনিক জনতার মতামত পরিবার
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কুমিল্লাসহ সারাদেশে মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত পরিবার: বাড়ছে অপরাধের ঝুকি

Shahjahan Bashar
October 27, 2026 11:12 am
Link Copied!

৬৩

গাজী জাহাঙ্গীর আলম জাবির, কুমিল্লা।।

জেলে বন্দি এক মাদকাসক্ত। নাম জিসান (ছদ্মনাম)। কোনো মামলায় গ্রেফতার হয়ে নয়, মাদক আসক্তি থেকে ছেলেকে ফেরানোর আশায় তাকে জেলে পাঠিয়েছে তার মা-বাবা। বিত্তশালী পরিবারের সন্তান জিসানকে এখনই জামিনে মুক্ত করতে চায় না তার বাবা- মা। তাদের আশা, নেশা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে তবেই ঘরে ফিরবে ছেলে। একসময় যে সন্তানকে ঘিরে ছিল পরিবারের স্বপ্ন, মাদক আসক্তি সেই পরিবারকেই ঠেলে দিয়েছে কঠিন বাস্তবতার মুখে। জিসানের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। মাদক আসক্তি এখন আর শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত সমস্যা কিংবা একটি পরিবারের সংকট নয়; এর প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অপরাধ প্রবণতা, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়। মাদক সংগ্রহের অর্থ জোগাড় করতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুকি যেমন রয়েছে, তেমনি মাদক পাচার, সহজলভ্যতা এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি), আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও জেল-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ধনী থেকে নিম্ন আয়ের পরিবার- কোনো শ্রেণিই এই ঝুঁকির বাইরে নয়। তবে মাদক আসক্তির কারণ এর পরিণতি এবং তা থেকে ফিরে আসার পথ ব্যক্তি ও পরিবার ভেদে আলাদা।

জেল-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাদক আসক্তির কারণে জেলে থাকা ধনাঢ্য পরিবারের অনেক সদস্য বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, ভ্রমণ কিংবা কৌতূহল থেকে প্রথম মাদক গ্রহণের কথা বলেছে। শুরুতে অল্প পরিমাণে সেবন করলেও পরে তা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়। দেশ-বিদেশে ঘোরাফেরা, অর্থের সহজলভ্যতা এবং অবসর কাটানোর বিকল্প কার্যক্রমের অভাবও কারো কারো ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরিবারের সদস্যরা যখন আসক্তির বিষয়টি বুঝতে পারেন, তত দিনে পরিস্থিতি অনেক দূর গড়ায়। সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব বাড়ে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সন্তানের মাদক আসক্তির শোকে মা-বাবার আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা জানায়। অনেক পরিবার সন্তানকে নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করালেও চিকিৎসা শেষে সুস্থ জীবন ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মহীনতা, উদ্দেশ্যহীন জীবন, পারিবারিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে মাদক আসক্তিকে কেবল সঙ্গ দোষ বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও মাদক সেবনের কারণে সহিংসতা সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্যের ক্ষতি করার ঘটনা ঘটতে পারে। এসব ঘটনার কতটি প্রকাশ্যে আসে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই।

অপরাধের সঙ্গে মাদকের যোগ:
মাদক আসক্তির প্রভাবনিম্ন আয়ের, গৃহহীন, ভবঘুরে, এতিম ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাদের কেউ কেউ মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি, অপহরণ প্রতারণা কিংবা মাদক পরিবহনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তবে মাদক ব্যবহারকারী মাত্রই অপরাধী, এমন ধারণার ভিত্তি নেই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিরোধ ও গবেষণা বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। মাদক নিয়ে বিরোধ, মাদক গ্রহণের পর সহিংসতা কিংবা মাদক ব্যবহারকারী নিজেই হত্যার শিকার হওয়ার মতো ঘটনা এর মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের গবেষণা পদ্ধতি, সময়কাল ও নমুনার বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা না যাওয়ায় সংখ্যাটিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রেণি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে; এমনকি টয়লেট এলাকায়ও নজরদারির ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

৮২ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করে:
২০২৫ সালে পরিচালিত একটি জাতীয় গবেষণার ফল অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় চার দশমিক ৮৮ শতাংশ। গবেষণায় পাচ হাজার ২৮০ জনের তথ্য নেয়া হয়; জরিপ চলে ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবহার শুরু করার ক্ষেত্রে অল্প বয়সীদের অংশ উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী আট থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮-২৫ বছর বয়সে মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী মাদক সহজলভ্য বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিরোধের উদ্যোগে কিশোর-তরুনদের পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ ও সহজ প্রাপ্যতা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে।

খ্যাতিমান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ মোহিত কামাল বলেন, ‘মাদক আসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানে শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করা নয়; এটি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ফিরে পাওয়া, জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এ জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পারিবারিক সহায়তা, চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যা, সমবয়সীদের সহায়তা, পুনরায় মাদক গ্রহণ প্রতিরোধ এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তার মতে, চিকিৎসা শেষে পুরনো পরিবেশে ফিরে যাওয়া, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক কলঙ্ক পুনরায় মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মাদক নির্ভর ব্যক্তিকে অপমানজনক নামে না ডেকে অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার পথে থাকা মানুষ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ একজন মানুষের বর্তমান সমস্যাই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।

চিকিৎসা চায় অনেকে, সুযোগ পায় কম:
জাতীয় গবেষণায় প্রায় ৬৯ শতাংশ উত্তরদাতা চিকিৎসা বা পুনর্বাসন এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবা চেয়েছে। অথচ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রকাশিত তথ্যে ২০২৫ সালে সরকারি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেয়া রোগীর পরিসংখ্যানও রয়েছে। অধিদফতরের প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী,
দেশে একটি কেন্দ্রীয় ও সাতটি বিভাগীয় সরকারি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৪০৩টি বেসরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের লাইসেন্সের তথ্য প্রকাশ করেছে অধিদফতর।

ডিএনসির মহাপরিচালক মো হাসান মারুফ জানান, ‘মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও জাতীয় সমস্যা, যা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শুধু আইন প্রয়োগ করে এর সমাধান সম্ভব নয়। মাদক-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, অপরাধ প্রমাণ হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। তার ভাষ্য, মাদক, সন্ত্রাস ও অনলাইনসহ সবধরনের জুয়ার বিরুদ্ধে সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করছে।’

সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে মাদক:
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করছে। ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চলের নিকটবর্তী অবস্থানও মাদক পাচারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভারত থেকে মাদক প্রবেশের পরিমাণ কমলেও মিয়ানমার থেকে হেরোইন, গাজা, আইস ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক আসছে।
দুই দেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে, এমন ২৪ জেলার প্রায় ১৫০টি পয়েন্টকে মাদক প্রবেশের ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, নওগাঁ, নেত্রকোণা, জামালপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও শেরপুর।
সীমান্তের দুর্গম এলাকা, নদীপথ, চর অঞ্চল ও প্রত্যন্ত গ্রাম ব্যবহার করে ছোট ছোট চালানে মাদক আনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরে বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মাদক পাচারের সঙ্গে হালকা বহনযোগ্য আগ্নেয়াস্ত্রও প্রবেশ করতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।

ঢাকা ইউনিভার্সিটির সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মো তৌহিদুল হক বলেন, ‘সীমান্তে মাদক ঠেকাতে টহল ও চেকপোস্টের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং ধারাবাহিক অভিযান চালানো প্রয়োজন। মাদক শতভাগ নির্মূল করা কঠিন হলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ এর নেতিবাচক প্রভাবরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়ছে।’ মাদক নিয়ন্ত্রণে তাই সরবরাহ বন্ধ, অপরাধ দমন, কিশোর-তরুণদের সুরক্ষা এবং মানসম্মত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন- সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু আসক্ত ব্যক্তিকে আটক বা পরিবারকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। জিসানের মতো তরুণদের সুস্থ জীবনে ফেরাতে চিকিৎসা পারিবারিক সহায়তা ও কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করাও জরুরি।

 

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।