ঢাকাSunday , 11 October 2026
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলামিক
  7. কবিতা
  8. কলাম
  9. কুমিল্লা জেলার খবর
  10. খেলা
  11. জাতীয়
  12. জেলা খবর
  13. তথ্যপ্রযুক্তি
  14. দৈনিক জনতার মতামত পরিবার
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন কি এখন বিলাসিতা? সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার

Shahjahan Bashar
October 11, 2026 7:37 am
Link Copied!

৩৭

নিউজ ডেস্ক
একটি পরিবারে মাস শেষে আয় হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের। অথচ মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায় সেই আয়। বাড়িভাড়া, বাজারসদাই, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাবের খাতা খুলতে হয়। কোথায় খরচ কমানো যায়, কোন প্রয়োজনটি আপাতত বাদ দেওয়া যায়, আর কোন স্বপ্নটি আরও কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখা যায়—এমন প্রশ্নই এখন বহু মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যসঙ্গী। যে মানুষটি প্রতিদিন সকালে পরিপাটি পোশাক পরে কর্মস্থলে যান, দায়িত্ব পালন করেন, সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন, তাঁর বুকের ভেতরেও হয়তো জমে থাকে অসংখ্য দুশ্চিন্তা। বাইরে থেকে তাঁকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি লড়ছেন সংসারের ব্যয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের প্রত্যাশার সঙ্গে। এই নীরব সংগ্রামের নামই মধ্যবিত্তের জীবন।

প্রশ্ন হলো, আয়ের চেয়ে ব্যয় যখন প্রতিনিয়ত বেড়ে যায়, তখন মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখার অধিকার কি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে? নিজের একটি বাড়ি, সন্তানের ভালো শিক্ষা, পরিবারের উন্নত চিকিৎসা কিংবা বছরে একবার প্রিয়জনদের নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা—এসব কি এখন কেবল সামর্থ্যবানদের জন্যই নির্ধারিত? বাস্তবতা বলছে, সীমিত আয়ের সঙ্গে বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে বহু পরিবারকে প্রতিনিয়ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। একদিকে পরিবারের চাহিদা, অন্যদিকে আয়ের সীমাবদ্ধতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে মধ্যবিত্তের স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারে মাসিক বেতনের একটি পরিকল্পিত হিসাব থাকত। কত টাকা বাড়িভাড়া, কত টাকা বাজার, কত টাকা সঞ্চয়—সবকিছুর জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সেই হিসাব আর আগের মতো মেলে না। আয় একই থাকলেও ব্যয়ের তালিকা দীর্ঘ হয়। ফলে সঞ্চয়ের জায়গাটি ক্রমেই ছোট হয়ে আসে। বাজারে গিয়ে একজন গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্ত্রীকে এখন শুধু পণ্য কিনলেই চলে না; প্রতিটি পণ্যের দাম মিলিয়ে দেখতে হয়। মাছ-মাংস, ডিম, সবজি, চাল, ডাল, তেল—কোনটি কিনবেন, কোনটি কম কিনবেন, আর কোনটি বাদ দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রয়োজন ও সামর্থ্যের টানাপোড়েনে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, সংসারের খরচ কমাতে গিয়ে অনেক সময় পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কিংবা সন্তানের বাড়তি শিক্ষার ব্যয় কমাতে হয়। অথচ এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; একটি সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন।

মধ্যবিত্তের সংকটের আরেকটি দিক হলো, তাঁরা অনেক সময় অভাবের কথা প্রকাশ করতে পারেন না। সমাজে তাঁদের পরিচয়—তাঁরা স্বাবলম্বী, শিক্ষিত, চাকরিজীবী কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায়ী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবী, সীমিত আয়ের শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কিংবা স্বল্প আয়ের সাংবাদিকের জীবনও ব্যয়ের চাপে বিপর্যস্ত হতে পারে। তাঁদের আয় হয়তো কাগজে-কলমে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য, কিন্তু পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ হিসাব করলে হাতে খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকে না। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই—তাঁরা অনেক সময় অভাবের কথা বলতে পারেন না, আবার অভাব এড়িয়ে চলার মতো আর্থিক সামর্থ্যও থাকে না। সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে গিয়ে অনেকেই নিজের প্রয়োজন কমান, ব্যক্তিগত আনন্দ বিসর্জন দেন এবং ভবিষ্যতের জন্য সামান্য সঞ্চয়টুকুও ধরে রাখতে পারেন না।

প্রতিটি মা-বাবার স্বপ্ন থাকে সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করার। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো, প্রয়োজনীয় বই-খাতা কেনা, কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা—এসবের পেছনে প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়ে। সন্তানকে ভালো ভবিষ্যৎ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা যখন আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তখন অভিভাবকের অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়। একইভাবে চিকিৎসার ব্যয়ও একটি পরিবারের আর্থিক স্থিতি নষ্ট করে দিতে পারে। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে নিয়মিত সংসার খরচের বাইরে নতুন ব্যয় তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হয়, সঞ্চয় ভাঙতে হয়, এমনকি সম্পদ বিক্রির সিদ্ধান্তও নিতে হয়। অথচ শিক্ষা ও চিকিৎসা কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। নাগরিকের আর্থিক সামর্থ্য যা-ই হোক, মানসম্মত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকা একটি ন্যায়সংগত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

শহরে বসবাসকারী মধ্যবিত্তের জন্য বাড়িভাড়া বড় একটি ব্যয়ের খাত। চাকরি, শিক্ষা কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে শহরে থাকতে হয়। কিন্তু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না থাকলে পরিবারের বাজেটের বড় অংশই বাসাভাড়ায় চলে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াত ব্যয়, যানজটের কারণে সময়ের অপচয় এবং কর্মস্থল থেকে দূরে বসবাসের বাড়তি খরচ। শহরে টিকে থাকার জন্য মানুষ প্রতিদিন শ্রম দেন, অথচ মাস শেষে নিজের শ্রমের যথাযথ আর্থিক স্বস্তি অনেকেই খুঁজে পান না। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—শহর কি শুধু বেশি আয় করা মানুষের জন্য, নাকি শ্রম দিয়ে শহরকে সচল রাখা সাধারণ মানুষেরও এখানে সম্মানজনকভাবে বসবাসের অধিকার রয়েছে?

সংসারের খরচ নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং পরিকল্পিত সঞ্চয় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তখন শুধু ব্যক্তিগত সাশ্রয় দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এখানে রাষ্ট্রীয় নীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, অসাধু মজুতদারি ও কারসাজি প্রতিরোধ, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বেতন কাঠামো, মূল্যস্ফীতি এবং প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা প্রয়োজন। শুধু বেতন বাড়লেই হবে না; সেই বেতনে মানুষ কতটা পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। মধ্যবিত্তের সংকট মোকাবিলায় এমন নীতি প্রয়োজন, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক চাপের মুখে না পড়ে।

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা নতুন নতুন স্থাপনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে দেখতে হবে, একজন সাধারণ মানুষ তাঁর আয়ে কতটা স্বচ্ছন্দে জীবন চালাতে পারছেন, তাঁর সন্তান কতটা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারছেন কি না এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করতে পারছেন কি না। একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর স্বপ্ন তাঁর নিজের একটি ছোট্ট বাড়ি। একজন শিক্ষকের স্বপ্ন সন্তানের উচ্চশিক্ষা। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর স্বপ্ন ব্যবসাটি একটু বড় করা। একজন সাংবাদিকের স্বপ্ন সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি পরিবারকে নিরাপদ জীবন দেওয়া। এসব স্বপ্ন বিলাসিতা নয়; এগুলো একটি স্বাভাবিক, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রত্যাশা। কিন্তু যখন মানুষকে প্রতিমাসে প্রয়োজন আর সামর্থ্যের মধ্যে কঠিন সমঝোতা করতে হয়, তখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনই সংকুচিত হয় না; সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। কারণ দীর্ঘদিন আর্থিক চাপে থাকা পরিবারগুলো সঞ্চয়, বিনিয়োগ, সন্তানদের বিকাশ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়তে পারে।

মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশ নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তাঁরা কাজ করেন, কর দেন, সন্তানদের মানুষ করেন, পরিবার সামলান এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখেন। বিনিময়ে তাঁদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়—আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের একটি বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহনীয় দাম, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের জন্য সামান্য সঞ্চয়ের সুযোগ। আজ তাই প্রশ্নটি শুধু মধ্যবিত্তের নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। যে সমাজে পরিশ্রমী মানুষও মাস শেষে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না, সেই সমাজের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। যে পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে গিয়ে নিজের বর্তমান প্রয়োজন বিসর্জন দেয়, তাদের বাস্তবতা নীতিনির্ধারণের আলোচনায় জায়গা পাওয়া জরুরি।

মধ্যবিত্তের স্বপ্নকে বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে সৎভাবে উপার্জন করে একজন মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন, পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবেন। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই সমৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের সংসারেও পৌঁছায়। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন বেঁচে থাকুক—কারণ সেই স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি স্থিতিশীল, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।