ঢাকাWednesday , 7 October 2026
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলামিক
  7. কবিতা
  8. কলাম
  9. কুমিল্লা জেলার খবর
  10. খেলা
  11. জাতীয়
  12. জেলা খবর
  13. তথ্যপ্রযুক্তি
  14. দৈনিক জনতার মতামত পরিবার
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মুক্তিযুদ্ধে ফরাসি বন্ধু আঁদ্রে মালরো: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এক বিশ্বমানবের অঙ্গীকার

Shahjahan Bashar
October 7, 2026 10:09 am
Link Copied!

৬৯

মোঃ শাহজাহান বাশার

১৯৭১,একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মম দমন-পীড়ন, হত্যা, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ যখন স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছে, তখন বিশ্বের নানা প্রান্তের বিবেকবান মানুষ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফরাসি সাহিত্যিক, দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক ও মানবতাবাদী আঁদ্রে মালরো (André Malraux)।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর নাম শুধু একজন বিদেশি সমর্থক হিসেবে নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ—যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক বিবেকের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

কে ছিলেন আঁদ্রে মালরো?

আঁদ্রে মালরো ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ফরাসি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। তিনি ঔপন্যাসিক, শিল্পতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। পরবর্তীতে তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ফ্রান্সের প্রথম সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর জীবনদর্শনে স্বাধীনতা, প্রতিরোধ এবং মানবিক মর্যাদা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের খবর তাঁর কাছে পৌঁছালে তিনি নীরব থাকেননি।

বাংলাদেশের পক্ষে কেন দাঁড়িয়েছিলেন মালরো?

১৯৭১ সালের জুলাই-আগস্ট থেকেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনের চেষ্টা চলছিল। মালরোর কাছে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও পৌঁছায়।

৯ আগস্ট ১৯৭১-এর একটি চিঠিতে তিনি ভারতের বিশিষ্ট লেখক রাজা রাওকে বাংলাদেশের বিষয়ে জানতে চান এবং মূল প্রশ্নটি তুলেছিলেন—বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই সংগ্রাম কি এমন একটি কারণ, যার জন্য জীবন উৎসর্গ করা যায়?

এটি শুধু একজন লেখকের সহানুভূতি প্রকাশ ছিল না। মালরো বিষয়টিকে মানবিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিলেন।

আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের প্রস্তাব

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মালরো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। তিনি ঘোষণা করেন যে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী বা ‘International Brigade’ গঠনের উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি নিজেও বাংলাদেশে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তিনি বাঙালিদের নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশে সামরিক কমান্ড গ্রহণ করতেও প্রস্তুত।

অর্থাৎ, মালরোর অবস্থান ছিল শুধু বক্তৃতা বা বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বাস্তবভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।

কিন্তু তিনি কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন?

এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন।

না—আঁদ্রে মালরো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে এসে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি।

কিছু লেখায় তাঁকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু তাঁর বাংলাদেশে এসে সরাসরি যুদ্ধ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

তাঁর নিজের একটি ১৯৭১ সালের চিঠিতেও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে সামরিক সহায়তার পরিকল্পনার কথা পাওয়া যায়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তিনি ও তাঁর সহযোগীরা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলেও ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ আছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই যাত্রা আর হয়নি।

নিক্সনের কাছে মালরোর খোলা চিঠি

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মালরোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক অবস্থানগুলোর একটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে তাঁর খোলা চিঠি।

১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ ফরাসি সংবাদপত্র Le Figaro-তে প্রকাশিত সেই চিঠিতে তিনি বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশা, শরণার্থী সংকট এবং পাকিস্তানি সামরিক দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—যে জনগণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল, তাদের নেতাকে কেন কারাগারে নেওয়া হলো এবং কেন লাখ লাখ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হলো?

মালরো তাঁর চিঠিতে শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তি দেন, বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কেবল একটি সাধারণ ভারত-পাকিস্তান সংঘাত হিসেবে দেখলে ১৯৭১ সালের মূল বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য মালরোর বার্তা

মালরোর অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি বাংলাদেশের সংকটকে কেবল একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং একটি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও কূটনীতিক সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর স্মৃতিচারণেও মালরোকে বাংলাদেশের অন্যতম দৃঢ় আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, মালরো ফ্রান্সের জনমত ও রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে মালরোর সম্পর্ক

মালরোর বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায়নি।

স্বাধীনতার পরও তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে তিনি বাংলাদেশ সফরে আসেন। এই সফর ছিল প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যে ব্যক্তি যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিকভাবে কথা বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর তিনি নিজ চোখে নতুন বাংলাদেশকে দেখতে এসেছিলেন।

২২ থেকে ২৪ এপ্রিল ১৯৭৩-এর সফরে মালরো বাংলাদেশে ব্যাপক সংবর্ধনা পান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সম্মান লাভ করেন। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে।

মালরোকে স্মরণ করার অর্থ কী?

আঁদ্রে মালরোর গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছিলেন। তাঁর গুরুত্ব আরও গভীরে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের যখন আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজন ছিল, তখন বিশ্বের একজন খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবী নিজের অবস্থান, খ্যাতি ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে বাংলাদেশের পক্ষে ব্যবহার করেছিলেন।

তিনি শুধু বলেননি—‘বাংলাদেশের জন্য আমার সহানুভূতি আছে।’

বরং তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজেই লড়াই করতে প্রস্তুত।

শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলেও তাঁর অবস্থান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

ইতিহাসের কাছে মালরোর উত্তরাধিকার

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিদেশি বন্ধুদের ভূমিকা স্মরণ করার সময় আঁদ্রে মালরোর নাম তাই বিশেষভাবে উচ্চারিত হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধ করেননি—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের কথা বলেছিলেন, নিজে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং পাকিস্তানি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কাজ করেছিলেন।

তাঁর ১৯৭১ সালের অবস্থান আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—

স্বাধীনতার সংগ্রাম কখনো শুধু একটি ভূখণ্ডের মানুষের সংগ্রাম হয়ে থাকে না; ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে তা পৃথিবীর বিবেকবান মানুষকেও স্পর্শ করতে পারে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আঁদ্রে মালরো সেই আন্তর্জাতিক বিবেকেরই এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি।

আঁদ্রে মালরো—ফ্রান্সের মাটিতে থেকেও যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিজের কণ্ঠ উচ্চ করেছিলেন। তাঁর সেই কণ্ঠ আজও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।