জহুরুল ইসলাম জুয়েল, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি:
মানিকগঞ্জ জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অধীনে থাকা প্রায় সাড়ে তিন হাজার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দীর্ঘদিন ধরে একটি বেসরকারি গুদামে চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপুল অর্থ মূল্যের এই প্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশের সিংহভাগই এখন সম্পূর্ণ অকেজো। অথচ এগুলো সংরক্ষণের জন্য প্রতি মাসে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) গুনতে হচ্ছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা ভাড়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কার্যকারিতা সচল রাখতে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১৫ দিন পরপর ইভিএমের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রকার চার্জ বা কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ না করায় যন্ত্রগুলোর কন্ট্রোল ইউনিট, মনিটর, ব্যাটারি ও সংযোগকারী তার নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এগুলো এখন আগামী কোনো নির্বাচনে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী。
তড়িঘড়ি কেনাকাটা ও অডিট আপত্তি:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে তৎকালীন কে এম নুরুল হুদা কমিশনের আমলে কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট সংরক্ষণ পরিকল্পনা ও বাজেট ছাড়াই তড়িঘড়ি করে প্রতিটি ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মূল্যে ধাপে ধাপে প্রায় দেড় লাখ ইভিএম কেনা হয়। পরবর্তীতে এগুলো সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের কাছে তহবিল চাওয়া হলেও তা মেলেনি। ফলশ্রুতিতে ২০২২ সাল থেকে মানিকগঞ্জসহ দেশের ৪১টি জেলায় বেসরকারি গুদাম ভাড়া নিয়ে এগুলো ফেলে রাখা হয়।
বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অকেজো এই ইভিএমগুলো পুড়িয়ে বিনষ্ট করার পরিকল্পনা থাকলেও কেনাকাটায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত এবং সিএজি কার্যালয়ের অডিট আপত্তির কারণে বিষয়টি ঝুলে আছে। এ ঘটনায় দুদক ইতোমধ্যে ইসির তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করলেও অডিট জটিলতায় তদন্ত প্রতিবেদন থমকে আছে।
উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, “জনগণের টাকায় কেনা বিপুল পরিমাণ ইভিএমের এই দশা অত্যন্ত দুঃখজনক। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রেখে কার্যকারিতা নষ্ট করার পাশাপাশি গুদাম ভাড়ার নামে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। কেনাকাটা ও রক্ষণাবেক্ষণের এই গলদ খতিয়ে দেখে দ্রুত দুদকের তদন্ত ও অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন রক্ষণাবেক্ষণের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, “নিয়মিত ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রতি মাসে গুদাম ভাড়া বাবদ ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় কমিশনের সিদ্ধান্ত পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা জানান, ইভিএম সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মূল এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। কমিশন থেকে যে ধরনের নির্দেশনা আসবে, স্থানীয় প্রশাসন সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

