ঢাকাSaturday , 29 August 2026
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলামিক
  7. কবিতা
  8. কলাম
  9. কুমিল্লা জেলার খবর
  10. খেলা
  11. জাতীয়
  12. জেলা খবর
  13. তথ্যপ্রযুক্তি
  14. দৈনিক জনতার মতামত পরিবার
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সবখবর

একজন সাংবাদিকের রাত- সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার, 

News Admin
August 29, 2026 6:06 pm
Link Copied!

৫৯

 

নিউজ ডেস্ক


রাত গভীর হলে শহর বদলে যায়। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে থেমে আসে। দোকানের ঝাঁপ নেমে যায়, রাস্তায় মানুষের ভিড় কমে যায়, ব্যস্ত যানবাহনের শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে। একসময় শহরটা এমন নীরব হয়ে পড়ে, যেন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সে নিজেই নিজের কাছে ফিরে গেছে। কিন্তু সেই গভীর রাতেও সবাই ঘুমিয়ে থাকে না। কোনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একজন চিকিৎসক জেগে থাকেন, কোনো সড়কের মোড়ে একজন পুলিশ সদস্য পাহারা দেন, কোনো কারখানায় একজন শ্রমিক রাতের শিফটে কাজ করেন, আর কোনো একটি অন্ধকার ঘরে টেবিলের ওপর ঝুঁকে একজন সাংবাদিক তখনও লিখে চলেন। তার চোখে ঘুম নেই, হাতে কলম, সামনে কম্পিউটারের আলো, পাশে রাখা মোবাইল ফোনটি কখনো নীরব, কখনো হঠাৎ কেঁপে ওঠে। অন্যদের কাছে এটি হয়তো একটি পেশা, কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে রাত অনেক সময় শুধু রাত নয়—রাত মানে অপেক্ষা, উদ্বেগ, দায়িত্ব, দৌড়ঝাঁপ, তথ্য যাচাই, মানুষের কান্না এবং সত্যকে খুঁজে বের করার এক দীর্ঘ সংগ্রাম। একটি ফোনকল কখনো কখনো পুরো রাতের হিসাব বদলে দেয়। “ভাই, একটা ঘটনা ঘটেছে। আপনি কি আসতে পারবেন?” ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা কিংবা দুইটা। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। স্ত্রীর চোখে ক্লান্তি। সন্তান হয়তো পাশের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য সাংবাদিকটিরও ইচ্ছে হয়—আজ না হয় না গেলেই হলো, আজ না হয় অন্য কারও কাছে দায়িত্বটা থাক। কিন্তু বিবেক তাকে থাকতে দেয় না। তিনি উঠে পড়েন, জুতা পরেন, মোবাইলটি পকেটে রাখেন, ক্যামেরা কিংবা নোটবুক হাতে নেন। তারপর নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে যান। পেছনে পড়ে থাকে একটি ঘুমন্ত পরিবার, সামনে অপেক্ষা করে একটি অজানা রাত। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তিনি দেখেন—মানুষের ভিড়। কারও চোখে আতঙ্ক, কারও চোখে রাগ, কারও চোখে পানি। কেউ একজন বারবার একই কথা বলছে, কেউ বলছে, “আমার ভাইটা বাঁচবে তো?” কেউ বলছে, “আমাদের বিচার কে করবে?” কেউ আবার কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “ভাই, আপনি খবরটা লিখবেন। আমাদের কথা মানুষকে জানাবেন।” সাংবাদিক তখন শুধু শুনছেন। তার সামনে একটি ঘটনা নয়—একটি পরিবার দাঁড়িয়ে আছে, একটি কান্না দাঁড়িয়ে আছে, একটি অসহায়ত্ব দাঁড়িয়ে আছে। তিনি প্রশ্ন করেন, নাম লেখেন, সময় নোট করেন, ছবি তোলেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য নেন। কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু দৃশ্য আসে, যেখানে সাংবাদিকের পরিচয়টি কয়েক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে যায়। তিনি তখন আর শুধু সাংবাদিক থাকেন না—তিনি একজন মানুষ হয়ে যান। একজন মায়ের কান্না দেখে তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে, একজন বাবার অসহায় মুখ দেখে নিজের বাবার মুখ মনে পড়ে, কোনো শিশুর আতঙ্কিত চোখ দেখে নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ে। কিন্তু চোখের পানি মুছে তাকে আবার কাজে ফিরতে হয়। কারণ তার হাতে যে কলম, সেটি শুধু তার নিজের নয়। তার কলমের ওপর নির্ভর করে হয়তো এমন একজন মানুষ, যার কাছে আর কোনো দরজা খোলা নেই। সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি হয়তো এখানেই। একজন সাংবাদিককে অনুভব করতে হয়, কিন্তু অনুভূতিতে ভেসে গেলে চলে না। তাকে মানুষের কষ্ট বুঝতে হয়, কিন্তু তথ্যের সত্যতা যাচাই করেও লিখতে হয়। তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে প্রমাণ খুঁজতে হয়। একটি ভুল সংবাদ শুধু একটি ভুল নয়। তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। একটি ভুল তথ্য একজন নির্দোষ মানুষের সম্মান নষ্ট করতে পারে, একটি অসতর্ক শব্দ একটি পরিবারের জীবনকে অস্থির করে দিতে পারে। তাই রাত যত গভীর হয়, সাংবাদিকের দায়িত্ব তত ভারী হয়ে ওঠে। তিনি লিখেন, আবার পড়েন, আবার যাচাই করেন। একটি নাম ঠিক আছে কি না দেখেন, একটি তারিখ মিলিয়ে নেন, একটি বক্তব্যের উৎস নিশ্চিত করেন। তারপরও কখনো মনে হয়—আরেকবার যাচাই করা দরকার। কারণ সত্যের সঙ্গে তাড়াহুড়ো করা যায় না। কিন্তু সত্যের পথ কখনোই মসৃণ নয়। একটি সংবাদ প্রকাশের পর ফোন আসতে পারে—“ভাই, খবরটা একটু বাদ দেন।” আরেকজন বলতে পারেন—“আপনি তো আমাদের পরিচিত মানুষ!” কেউ হয়তো বন্ধুত্বের কথা মনে করিয়ে দেবেন, কেউ সম্পর্কের, কেউ ক্ষমতার, কেউ হয়তো সরাসরি ভয় দেখাবেন। সাংবাদিক ফোনটি কানে নিয়ে নীরবে শুনবেন। তারপর ফোন রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকবেন। এরপর নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করবেন—“আমি কি সত্য লিখব, নাকি কারও মন রক্ষা করব?” এই প্রশ্নের উত্তরই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। কারণ সাংবাদিকের হাতে থাকা কলমটি খুব ছোট একটি বস্তু। কিন্তু সেই ছোট্ট কলম কখনো কখনো ক্ষমতার বড় দেয়ালে প্রশ্নের দাগ কাটতে পারে। একটি প্রতিবেদন কোনো অন্যায় বন্ধ করতে পারে, কোনো অসহায় মানুষের কাছে সাহায্যের দরজা খুলে দিতে পারে, কোনো নিখোঁজ মানুষের সন্ধান এনে দিতে পারে, কোনো দুর্নীতির তথ্য সামনে আনতে পারে। আবার একটি সত্য সংবাদ সমাজকে নিজের আয়নায় নিজের মুখ দেখতে বাধ্য করতে পারে। তবু সাংবাদিকের নিজের জীবনটাও তো একটি জীবন। তারও পরিবার আছে, তারও সন্তান আছে, তারও অসুস্থতা আছে, তারও ক্লান্তি আছে, তারও ভয় হয়। তারও কখনো কখনো মনে হয়—সব ছেড়ে দিয়ে শান্তিতে বাঁচি। কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটি ফোন আসে, আরেকটি ঘটনা ঘটে, আরেকজন মানুষ বলে—“ভাই, আপনি একটু দেখবেন?” আর তিনি আবার বেরিয়ে পড়েন। এই বেরিয়ে পড়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। ঈদের রাত হতে পারে, বৃষ্টির রাত হতে পারে, শীতের কুয়াশা হতে পারে, ঝড়ের রাত হতে পারে, কিংবা এমন কোনো রাত, যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে। সাংবাদিক তখন রাস্তায়। কারণ খবর কখনো সময় দেখে আসে না। ভোরের দিকে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন শহর আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে। পাখিরা ডাকছে, মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে, কেউ কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ বাজারে যাচ্ছে, কেউ স্কুলের পোশাক পরছে। শহর জানে না—এই নতুন সকালটির একটি খবর তৈরির পেছনে কেউ একজন পুরো রাত জেগে ছিল। তার স্ত্রী হয়তো ঘুমের মধ্যে একবার দরজার শব্দ শুনে চোখ মেলেছেন। সন্তান হয়তো জানেই না, বাবা কখন ফিরেছেন। টেবিলের ওপর হয়তো পড়ে আছে রাতের খাবার, ঠান্ডা হয়ে গেছে। তিনি হয়তো খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ক্ষুধা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্তি। কম্পিউটারের সামনে বসে শেষবারের মতো সংবাদটি পড়েন। তারপর ‘সেন্ড’ করেন। খবরটি এখন আর তার হাতে নেই। কিছুক্ষণ পর সেটি মানুষের হাতে পৌঁছাবে। কেউ পড়বে, কেউ প্রশংসা করবে, কেউ বিরক্ত হবে, কেউ হয়তো রাগ করবে। কিন্তু কেউ জানবে না—এই কয়েকশ শব্দের পেছনে ছিল একটি নির্ঘুম রাত, ছিল কয়েক মাইল পথ, ছিল অসংখ্য ফোনকল, ছিল মানুষের কান্না, ছিল সাংবাদিকের নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ। একজন সাংবাদিক সবসময় আলোয় থাকেন না। কখনো তিনি থাকেন অন্ধকারে। কখনো তিনি ক্যামেরার সামনে থাকেন না—ক্যামেরার পেছনে থাকেন। কখনো তার নিজের নামটিও খবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হয় সেই মানুষটি, যার কথা তিনি তুলে ধরেছেন। সেই কৃষক, যে ন্যায্য দাম পায়নি; সেই শ্রমিক, যে মাসের পর মাস মজুরি পায়নি; সেই মা, যে সন্তানের চিকিৎসার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; সেই বৃদ্ধ, যার জমি দখল হয়ে গেছে; সেই শিক্ষার্থী, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে; সেই পরিবার, যে বিচার চেয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছে। তাদের গল্পই সাংবাদিকের গল্প। তাদের কান্নাই তার কলমের কালি। তাদের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাই তার পেশার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। একজন সাংবাদিক হয়তো পৃথিবীর সব অন্যায় দূর করতে পারবেন না। তিনি হয়তো প্রতিটি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না। সব সত্যও হয়তো একদিনে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবু তিনি চেষ্টা করেন। কারণ তিনি জানেন—অন্যায়কে থামানোর আগে তাকে দৃশ্যমান করতে হয়। যে অন্যায় অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে, তাকে আলোয় আনাই সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব। আর সেই আলো জ্বালাতে গিয়ে কখনো কখনো সাংবাদিককেই সবচেয়ে বেশি অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয়। রাত শেষ হয়। ভোর আসে। পত্রিকার পাতায় খবর ছাপা হয়। মানুষ চায়ের কাপ হাতে সংবাদ পড়ে। কেউ রাজনীতি পড়ে, কেউ অর্থনীতি, কেউ খেলাধুলা, কেউ স্থানীয় খবর। কেউ হয়তো চোখ বুলিয়ে চলে যায় সেই ছোট্ট সংবাদটির ওপর, যার পেছনে একজন সাংবাদিকের পুরো রাত কেটে গেছে। কেউ জানে না তার গল্প। কেউ জানে না কতবার সে ভয় পেয়েছে। কেউ জানে না কতবার পরিবারের মুখ মনে পড়েছে। কেউ জানে না কত রাত তার নিজের সন্তান ঘুমিয়ে পড়েছে বাবার অপেক্ষায়। কেউ জানে না কত সকাল সে ঘুমাতে গেছে, যখন অন্যরা নতুন দিনের কাজে বেরিয়েছে। তবু সে আবার জেগে উঠবে, আবার কলম ধরবে, আবার প্রশ্ন করবে, আবার ছুটবে। কারণ তার কাছে সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়। এটি মানুষের গল্প বলার দায়িত্ব, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস, এটি সত্যের কাছে দায়বদ্ধ থাকার এক নীরব অঙ্গীকার। আর তাই যখন একটি শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন কোনো না কোনো জানালার পাশে একজন সাংবাদিক জেগে থাকেন। তার চোখে হয়তো ক্লান্তি, বুকে হয়তো অজানা ভয়, মনে হয়তো পরিবারের জন্য অপরাধবোধ—তবু হাতে থাকে কলম। কারণ তিনি জানেন, একটি সত্য কখনো শুধু একটি খবর নয়। একটি সত্য কখনো একজন মানুষের আশ্রয়, কখনো একটি পরিবারের শেষ আশা, কখনো একটি সমাজের বিবেক, আর কখনো একটি পরিবর্তনের প্রথম শব্দ। তাই রাত যত গভীরই হোক, সত্যের সন্ধানে সেই মানুষটি জেগে থাকেন। শহর ঘুমায়, রাস্তা ঘুমায়, বাড়িগুলো ঘুমায়—কিন্তু সাংবাদিকের কলম ঘুমায় না। কারণ যতক্ষণ অন্যায় আছে, ততক্ষণ প্রশ্ন থাকবে; যতক্ষণ মানুষের কান্না আছে, ততক্ষণ কলম কথা বলবে; আর যতক্ষণ সত্য বেঁচে আছে, ততক্ষণ একজন সাংবাদিকের রাত কখনো পুরোপুরি শেষ হবে না।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।