জহুরুল ইসলাম জুয়েল, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি:
ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের শততম জন্মবার্ষিকী (৩০ অক্টোবর) পেরিয়ে গেলেও এবার ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা। তবে রাষ্ট্রীয় আয়োজন না থাকলেও এই মহান বীরের জন্মভূমি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার রফিকনগরে (সাবেক পারিল) স্থানীয় উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী মেলা ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে, যা গতকাল শুক্রবার রাতে সমাপ্ত হয়। শহীদ রফিকের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. খোরশেদ আলমের উদ্যোগে এবং ভাষাশহীদ রফিক স্মৃতি পরিষদের ব্যবস্থাপনায় গত ২৮ অক্টোবর থেকে এই আয়োজন শুরু হয়েছিল।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রফিকনগরে ‘শহীদ রফিক মঞ্চে’ আয়োজিত সমাপনী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে জন্মশতবার্ষিকীর কেক কাটেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা। বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে ও প্রভাষক জগদীশ চন্দ্র মালোর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহরম আলী, সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুন্নাহার পপি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল আমিন কবির। এছাড়াও একুশে পদকপ্রাপ্ত কাওসার চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা মফতেজুর রহমান ও শহীদ রফিকের ভাতিজা আবদুর রউফসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে সন্ধ্যায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে বের হওয়া মিছিলে শামিল হয়েছিলেন তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের হিসাববিজ্ঞানের ২৬ বছর বয়সী ছাত্র রফিক। পুলিশের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই নির্মম হত্যাকাণ্ড অস্বীকার করে ‘আত্মরক্ষার্থে গুলি’র যে বয়ান তৈরি করেছিল, তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন আলোকচিত্রী আমানুল হকের তোলা একটি মাত্র সাদা-কালো ছবি।
মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি হলের পেছনের এক গোপন কক্ষে গুমের উদ্দেশ্যে রাখা শহীদ রফিকের ক্ষতবিশত মরদেহের তথ্য পান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রচার দপ্তরের সহকারী পরিচালক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিস। মেডিকেল ছাত্রী হালিমা খাতুনের সহায়তায় কঠোর নজরদারি এড়িয়ে সেই কক্ষে প্রবেশ করে জাইস আইকন ক্যামেরায় গোপনে ঐতিহাসিক ছবিটি তোলেন আমানুল হক। পরবর্তীতে রাতের আঁধারে ছবিটির ব্লক তৈরি করে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুলিশ এসে তা বাজেয়াপ্ত করে।
আমানুল হক ছাড়াও ওই দিন রফিকের মরদেহের ছবি তুলেছিলেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক মীজানুর রহমান। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা যখন তাঁকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান, তখন তিনি এই ছবি তোলেন। তবে প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ১৯৫২ সালে ছবিটি ছাপা সম্ভব না হলেও পরের বছর একুশের বিশেষ সংখ্যায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক এবং পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগের লিফলেটে ছবিটি প্রকাশ পায়।
জন্মের একশ বছর পেরিয়ে গেলেও এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব সত্ত্বেও মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ রফিকের অবদান ও তাঁর মরদেহের সেই ঐতিহাসিক আলোকচিত্র বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

